যারা গায়বের প্রতি ঈমান আনে

যারা গায়বের প্রতি ঈমান আনে, নামায কায়িম করে এবং আমি যে জীবনোপকরণ তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।

الَّذِيۡنَ يُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡغَيۡبِ وَ يُقِيۡمُوۡنَ الصَّلٰوةَ وَمِمَّا رَزَقۡنٰهُمۡ يُنۡفِقُوۡنَۙ‏ ٣ 1

হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন যে,

সত্য বলে স্বীকার করাকে ঈমান বলে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এটাই বলেন। হযরত যুহরী (রঃ) বলেন যে, ‘আমলকে ঈমান বলা হয়। হযরত রাবী’ বিন আনাস (রাঃ) বলেন যে, ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা।

ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে,

এসব মতের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। এগুলোর একই অর্থ। ভাবার্থ এই যে, তারা মুখের দ্বারা, অন্তর দ্বারা ও আমল দ্বারা অদৃশ্যের উপর ঈমান আনে এবং আল্লাহর ভয় রাখে।

ঈমান‘ শব্দটি আল্লাহর উপর, তার কিতাব সমূহের উপর এবং তাঁর রাসূলগণের (আঃ) উপর বিশ্বাস স্থাপন করা-এ কয়টির সমষ্টিকে বুঝিয়ে থাকে।

আমি বলি যে, আভিধানিক অর্থে শুধু সত্য বলে স্বীকার করাকেই ঈমান বলে।

কুরআন মাজীদের মধ্যেও এ অর্থের ব্যবহার এসেছে। যেমন আল্লাহ পাক বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ তারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং ঈমানদারগণকে সত্য বলে স্বীকার করে। (৯:৬১)

হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ভ্রাতাগণ তাদের পিতাকে বলেছিলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ আমরা সত্যবাদী হলেও আপনি আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না। (১২:১৭)

এভাবে ‘ঈমান শব্দটি ইয়াকীনের অর্থেও এসে থাকে যখন ওটা আমলের বর্ণনার সঙ্গে মিলিত হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ (১০৩:৩) (আরবি) কিন্তু যখন ওটা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হবে তখন ঈমানে শরঈ’ হবে-অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকারোক্তি এবং কার্যসাধনা এই তিনের সমষ্টির নাম।

অধিকাংশ ইমামের এটাই মাযহাব। ইমাম শাফিঈ (রঃ), ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ), ইমাম আবু উবাইদাহ (রঃ) প্রভৃতি ইমামগণ একমত হয়ে বর্ণনা করেছেন।

যে, মুখে উচ্চাণ করা ও কার্যসাধন করার নাম হচ্ছে ঈমান এবং ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। এর প্রমাণ আছে বহু হাদীসে যা আমরা বুখারী শরীফের শরাহতে বর্ণনা করেছি।কেউ কেউ ঈমানের অর্থ করেছেন আল্লাহর ভয়।

যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ

অর্থাৎ “নিশ্চয় যারা তাদের প্রভুকে না দেখেই ভয় করে। 2

অন্য এক জায়গায় তিনি বলেছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহকে না দেখেই ভয় করেছে এবং (আল্লাহর দিকে) প্রত্যাবর্তনকারী অন্তর নিয়ে এসেছে।’ 3
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ভয়ই হচ্ছে ঈমান ও ইলমের সারাংশ। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহকে তাঁর আলেম বান্দাগণই ভয় করে থাকে। 4

কেউ কেউ বলেছেন যে, তারা বাহ্যিকভাবে যেমন ঈমান আনে তদ্রুপ ভিতরেও ঈমান এনে থাকে। তারা ঐ মুনাফিকদের মত নয় যাদের সম্বন্ধে আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ (আরবি)অর্থাৎ যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং যখন তারা তাদের শয়তানদের সন্নিকটে একাকী হয় তখন বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমরা শুধু উপহাস করছিলাম।’ 5

অন্য জায়গায় মুনাফিকদের অবস্থা নিম্নরূপ বর্ণিত হয়েছেঃ (আরবি)অর্থাৎ মুনাফিকেরা যখন তোমার নিকট আগমন করে তখন বলে আমরা (অন্তরের সঙ্গে) সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল, আর এটা তো আল্লাহ ভালভাবে অবগত আছেন যে, তুমি আল্লাহর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মুনাফিকরাই মিথ্যাবাদী।’ 6

এই অর্থ হিসেবে (আরবি) শব্দটি (আরবি) হবে, অর্থাৎ তারা ঈমান আনয়ন করে এমন অবস্থায় যে, মানুষ হতে তা পোগন থাকে। এখানে আয়াতে যে (আরবি) শব্দটি রয়েছে তার অর্থ সম্বন্ধেও মুফাসৃসিরগণের মধ্যে অনেক মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ঐ সবগুলোই সঠিক এবং সব অর্থই নেয়া যেতে পারে।

আবুল আলিয়া (রঃ) বলেন যে

এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর উপর, ফেরেশতাদের উপর,কিতাবসমূহের উপর, কিয়ামতের উপর, বেহেশতের উপর, দোযখের উপর, আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের উপর এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।

কাতাদাহ্ বিন দায়মারও (রঃ) এটাই মত।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং আরও কয়েকজন সাহাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ সব গোপনীয় জিনিস যা দৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে। যেমন জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি যা কুরআন মাজীদে উল্লিখিত আছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ‘আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে যা এসেছে সবই এর অন্তর্গত। 

হযরত জার (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ কুরআন’। আতা’ বিন আবু রাবাহ্ (রঃ) বলেন যে, আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীই হচ্ছে অদৃশ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী। 

 ইসমাঈল বিন আবু খালিদ (রাঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ইসলামের সমুদয় গোপনীয় বিষয়সমূহ। যায়েদ বিন আসলাম (রঃ) বলেন যে, এর অর্থ হচ্ছে ভাগ্যের উপর বিশ্বাস স্থাপন। সুতরাং এ সমস্ত কথা অর্থ হিসেবে একই। কেননা এসব জিনিসই অদৃশ্য এবং (আরবি) এর তাফসীরের মধ্যে এসবই জড়িত রয়েছে এবং সবগুলোর উপরেই ঈমান আনা ওয়াজিব। 

একদা হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রাঃ) মজলিসে সাহাবীগণের (রাঃ) গুণাবলীর আলোচনা চলছিল। তিনি বলেনঃ যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে দেখেছেন। তাদের তো কর্তব্যই হলো তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা; 

কিন্তু আল্লাহর শপথ! ঈমানী মর্যাদার দিক দিয়ে তাঁরাই উত্তম যারা না দেখেই তাঁকে বিশ্বাস করে থাকেন।

ঈমান তো ঐ সব লোকের যারা তোমাদের পরে আসবে, তারা দুই জিলদের মধ্যে কিতাব পাবে এবং তার উপরেই ঈমান এনে আমল করবে। তারাই তোমাদের দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী।”

রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদা সাহাবীগণকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমাদের মতে ঈমান আনার ব্যাপারে সর্বোত্তম কে?’ তারা বলেনঃ “ফেরেশতাগণ।’ তিনি বলেন, তারা কেন ঈমান আনবে না? তারা তো প্রভুর নিকটেই আছে। সাহাবীগণ (রাঃ) বলেন, তারপর নবীগণ (আঃ)।’ তিনি বলেন, ‘তারা ঈমান আনবে না কেন? তাদের উপর তো ওয়াহী অবতীর্ণ হয়ে থাকে। তারা বলেন, ‘তাহলে আমরা।’ তিনি বলেন, তোমরা ঈমান কবুল কেন করবে না? আমি তোমাদের মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছি। জেনে রেখো, আমার মতে সর্বোত্তম ঈমানদার তারাই হবে যারা তোমাদের পরে আসবে। সহীফাসমূহের মধ্যে তারা লিখিত পুস্তক পাবে এবং তার উপরেই তারা ঈমান আনবে।’

কাতাদাহ্ (রঃ) বলেন যে, নামায প্রতিষ্ঠিত করার অর্থ হচ্ছে নামাযের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, ভালভাবে অযু করা এবং রুকূ’ ও সিজদাহ্ যথাযথভাবে আদায় করা।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে হযরত ইবনে উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি।

  • (১) আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদ ও মুহাম্মদ (সঃ)-এর প্রেরিতত্বের সাক্ষ্য প্রদান।
  • (২) নামায প্রতিষ্ঠিত করণ।
  • (৩) যাকাত প্রদান।
  • (৪) রমযান শরীফের রোযা পালন এবং
  • (৫) বায়তুল্লাহ শরীফের হজ্জ কার্য সম্পাদন।

তথ্যসূত্র

  1. কুরআন মাজীদ, সূরা বাক্বারা, আয়াতঃ ৩ ↩︎
  2.  (৬৭:১২) ↩︎
  3. (৪০:৩৩) ↩︎
  4. (৩৫:২৮) ↩︎
  5. (২:১৪) ↩︎
  6. (৬৩:১) ↩︎

Home | Article | Books

Leave a Reply