ইসলামের প্রথম স্তম্ভ ঈমান কী? কুরআন ও হাদিসের আলোয়ে বিস্তারিত
Islamer Prtohom Stomvo Imaan

মানুষের জীবন ও পরকালের সফলতার একমাত্র ভিত্তি হলো সঠিক আক্বিদা বা বিশ্বাস। ইসলাম ধর্মে প্রবেশ এবং এর মূল ভিত্তির সূচনা হয় ঈমানের মাধ্যমে। ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি—যার মধ্যে সর্বপ্র্রথম এবং প্রধান স্তম্ভ হলো ঈমান বা শাহাদাতাইন। নিচে পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে ইসলামের প্রথম স্তম্ভ ঈমানের বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হলো,
১. ইসলামের প্রথম স্তম্ভ ঈমান (শাহাদাতাইন) বলতে কী বোঝায়?
‘ঈমান‘ শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো— বিশ্বাস করা, আস্থা স্থাপন করা এবং মনে প্রাণে মেনে নেওয়া। পরিভাষায়, অন্তরে বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং সে অনুযায়ী আমল করাকে ঈমান বলে।
ইসলামের পরিভাষায় ঈমানের মূল ঘোষণা হলো শাহাদাতাইন বা দুটি সাক্ষ্য প্রদান করা:
- প্রথম সাক্ষ্য: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য বা মাবুদ নেই (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)।
- দ্বিতীয় সাক্ষ্য: হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল (মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ)।
২. পবিত্র কুরআনের আলোকে ঈমানের প্রমাণ ও গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঈমানকে জান্নাত লাভ এবং সফলতার প্রধান শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। নিম্নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত উল্লেখ করা হলো:
আয়াত ১:
“আর যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করবে, তবে তা ককখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
— (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫)
আয়াত ২:
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করো এবং মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।”
— (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০২)
আয়াত ৩:
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং ভালো কাজ করেছে, তাদের জন্য রয়েছে ফেরদাউসের বাগান আপ্যায়নস্বরূপ।”
— (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ১০৭)
৩. হাদিসের আলোকে ইসলামের প্রথম ঈমান এর মর্যাদা
হাদিস শরিফে ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে ঈমানের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈমানকে দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
হাদিস ১:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
“ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত— ১. এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল; ২. সালাত কায়েম করা; ৩. যাকাত প্রদান করা; ৪. হজ করা এবং ৫. রমজানের রোজা রাখা।”
— (সহিহ বুখারি: ৮, সহিহ মুসলিম: ১৬)
হাদিস ২:
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, ঈমানের শাখা কয়টি সে সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“ঈমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা হলো ঈমানের একটি বিশেষ শাখা।”
— (সহিহ মুসলিম: ৩৫)
৪. ঈমানের মৌলিক বিষয়সমূহ (আরকানুল ঈমান)
শুধু মুখে স্বীকার করার নামই পূর্ণাঙ্গ ঈমান নয়, বরং অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে ৬টি বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়: ১. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস
২. তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস
৩. তাঁর আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস
৪. তাঁর রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস
৫. আখিরাত বা পরকালের প্রতি বিশ্বাস
৬. তাকদির বা ভালো-মন্দের নির্ধারিত পরিমাণের প্রতি বিশ্বাস
৫. ঈমান মজবুত করার উপায়
একজন মুমিনের জীবনে ঈমান সবসময় একই স্তরে থাকে না; কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। ঈমান সতেজ ও মজবুত রাখতে নিচের কাজগুলো করা উচিত:
- নিয়মিত কোরআন মাজিদ অর্থ ও তাফসীরসহ তিলাওয়াত করা।
- সহিহ ইলম বা দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা।
- নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় করা।
- সৎ সঙ্গ অবলম্বন করা এবং ভালো মানুষের সাথে চলাফেরা করা।
- বেশি বেশি জিকির, ইস্তিগফার এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকা।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ঈমান হলো মানুষের মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। দুনিয়ার জীবনে শান্তি এবং আখিরাতের অনন্ত মুক্তির জন্য এই প্রথম স্তম্ভের ওপর অটল ও অবিচল থাকা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক আক্বিদা ও সহিহ ঈমানের ওপর জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।