ভরসার মধ্যে শিরক

ভরসার মধ্যে শিরক

বইঃ আল ইরশাদ-সহীহ আকীদার দিশারী

লেখকঃ শাইখ ড. ছলিহ ইবনে ফাওযান আল ফাওযান

যেসব ইবাদত এখলাসের সাথে কেবল আল্লাহর জন্যই সম্পন্ন করা আবশ্যক, তার প্রকারসমূহের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার উপর ভরসা করা বিরাট একটি ইবাদত।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘‘তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করো’’। (1)

আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করার প্রকারসমূহ

আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর التوكل বা ভরসা করার প্রথম প্রকার হলো, যেসব বিষয়ের উপর আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ক্ষমতা রাখে না ঐসব বিষয়ের উপর ভরসা করা। যেমন সাহায্য, বিপদাপদ থেকে নিরাপত্তা, রিযিক, শাফা‘আত ইত্যাদি উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মৃত ব্যক্তি, অনুপস্থিত অথবা তাগুতের উপর ভরসা করা বড় শিরক।

দ্বিতীয় প্রকার التوكل হলো, বাহ্যিক উপায়-উপকরণের উপর নির্ভর করা। যেমন কেউ রাজা-বাদশাহর উপর নির্ভর করলো অথবা শাসকদের উপর নির্ভর করলো অথবা অন্য কোনো জীবিত ক্ষমতাবান ব্যক্তির ঐসব ক্ষমতার উপর নির্ভর করলো, যা আল্লাহ তাকে দিয়েছেন যেমন দান করা কিংবা দুঃখ-কষ্ট দূর করা অথবা অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ে বাহ্যিক উপকরণের উপর নির্ভর করলো। এ ধরণের নির্ভর করা ছোট শিরক। কেননা এতে আল্লাহর পরিবর্তে ব্যক্তি বিশেষের উপর ভরসা করা হয়।

তৃতীয় প্রকার التوكل হলো, যেমন মানুষ এমন কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করলো, যে তার কাজ-কর্মগুলো করে দিবে। যেমন ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি। এটি জায়েয। তবে যে জন্য তাকে উকীল নিযুক্ত করা হলো, তা অর্জনের ব্যাপারে তার উপর ভরসা করা যাবে না। বরং আল্লাহর উপরই ভরসা করবে। তিনি যেন তার ঐসব কাজ সহজ করে দেন, যা তিনি নিজে অর্জন করতে চাচ্ছেন অথবা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে অর্জন করতে চাচ্ছেন। কেননা বৈধ বিষয়াদি অর্জনের ক্ষেত্রে কাউকে উকীল বানানো উপায়-উপকরণ গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত। উপায়-উপকরণের উপর নির্ভর করা যাবে না। বরং কেবল আল্লাহ তা‘আলার উপরই নির্ভর করতে হবে। তিনিই সকল উপায় উপকরণের স্রষ্টা, তিনি উপায়-উকরণ এবং সেটা গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফলেরও স্রষ্ট।

অকল্যাণ প্রতিরোধ করা, রিযিক লাভ করা এবং যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ দিতে পারে না, তা পাওয়ার জন্য কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করা বিরাট একটি ইবাদত। সুতরাং এসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর নির্ভর করা বড় শিরক।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন

‘‘তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করো’’। (2)

আল্লাহ এখানে কেবল তার উপরই ভরসা করার আদেশ দিয়েছেন। কেননা বাক্যের মধ্যে معمول কে عامل এর পূর্বে উল্লেখ করা হলে সীমাবদ্ধতার অর্থ প্রদান করে। আর এখানে আল্লাহর উপর ভরসা করাকে ঈমান সহীহ হওয়ার শর্তারোপ করা হয়েছে। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলা কারো ইসলাম সহীহ হওয়ার জন্যও তার উপর ভরসা করার শর্তারোপ করেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন

‘‘ মূসা তার কওমকে বলল, হে লোকেরা! যদি তোমরা সত্যিই আল্লাহর প্রতি ঈমান রেখে থাকো তাহলে কেবল তার উপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাকো’’। (3)

উপরের আয়াত দু’টি প্রমাণ করে যে, যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে না অথবা তাকে ছাড়া অন্যের উপর ভরসা করে তাদের ঈমান বা ইসলাম কোনোটিই সঠিক নয়। যেসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কোনো ক্ষমতা নেই তাতে কবরবাসী ও সমাধিস্থ ব্যক্তিগণ এবং মূর্তিদের উপর নির্ভর করা হলে ঈমান ও ইসলাম উভয়টি ভঙ্গ হয়ে যাবে।

সুতরাং আল্লাহর উপর ভরসা করা ফরয। তাই এখলাসের সাথে তার উপর ভরসা করা আবশ্যক। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর উপর ভরসা সমস্ত ইবাদতের মূল, তাওহীদের সর্বোচ্চ স্তর। কেননা এ থেকেই অন্যান্য সৎ আমলের উৎপত্তি হয়। কেননা বান্দা যখন তার দুনিয়া-আখিরাতের সমস্ত কাজে কেবল আল্লাহর উপর ভরসা করবে এবং তিনি ব্যতীত অন্যান্য জিনিষের উপর ভরসা করা বাদ দিবে, তখনই তার এখলাস বিশুদ্ধ হবে এবং আল্লাহর সাথে তার সম্পর্কও ঠিক হবে।

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন

যখন কেউ কোনো সৃষ্টির কাছে আশা-আকাঙ্খা করেছে এবং তার উপর ভরসা করেছে, তখন সেই সৃষ্টির ব্যাপারে তার ধারণা ব্যর্থ হয়েছে। শাইখুল ইসলামের উক্তি এখানেই শেষ।

সূরা ফাতিহার আয়াতঃ ‘‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি ও শুধু তোমার কাছেই সাহায্য চাই’’

এর সর্বোচ্চ স্তর হলো আল্লাহর উপর ভরসা করা। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার উপর পরিপূর্ণরূপে ভরসা করা ব্যতীত তাওহীদের তিনটি প্রকার কেউ পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে পারবে না।

কুরআন এর বাণী

‘‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক। তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। তাই তাকে নিজের উকীল হিসাবে গ্রহণ করো’’। 4

আল্লাহ তা‘আলা বলেন

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য আল্লাহ তা‘আলাই যথেষ্ট। নিশ্চয় আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করবেনই’’। (5)

ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম; আল্লাহ তা‘আলার বাণী

‘‘তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাকো, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা করো’’ (6)

-এর উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ এখানে ঈমানদার হওয়ার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করার শর্তারোপ করেছেন। এতে বুঝা গেলো আল্লাহর উপর ভরসা না থাকলে ঈমান থাকে না। বান্দার ঈমান যতই বৃদ্ধি পাবে, আল্লাহর উপর তার ভরসাও ততো মজবুত হবে। ঈমান যখন দুর্বল হবে, তখন ভরসাও দুর্বল হবে।

দেহ ছাড়া যেমন মাথার অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, ঠিক তেমনি তাওয়াক্কুলের ভিত্তি ছাড়া অন্য কিছুর উপর ঈমান, ঈমানের শাখাসমূহ ও ঈমানের আমলসমূহ ঠিক হয় না।

আল্লাহ্‌ বলেন

‘‘মুমিন তো তারাই, যাদের অন্তরসমূহ আল্লাহর নাম নেয়া হলে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়। আর যখন তার আয়াত তাদের সামনে পাঠ করা হয়, তখন সেটা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে। আর তারা তাদের প্রভুর উপর ভরসা রাখে’’(7)

উপরোক্ত আয়াতে প্রকৃত মুমিনদেরকে ইহসানের তিনটি গুণে বিশেষিত করেছেন।

  • (১) তারা আল্লাহকে ভয় করে।
  • (২) আল্লাহর আয়াত শুনে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং
  • (৩) তারা একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে।

কুরআন এর বাণী

‘‘হে ঈমানদারগণ! সতর্কতা অবলম্বন করো। অতঃপর পৃথক পৃথক বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বের হয়ে পড়ো অথবা এক সাথে বের হয়ে পড়ো’’। (8)

‘‘আর তোমরা তাদের যথাসাধ্য শক্তি ও সুসজ্জিত ঘোড়া যোগাড় করে রাখো। এর মাধ্যমে তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রুকে, তোমাদের শত্রুকে’’। (9)

‘‘অতঃপর যখন সালাত শেষ হয়ে যায় তখন ভূ-পৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো এবং অধিক মাত্রায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো। যাতে তোমরা সফলকাম হও’’। (10)

ইউসুফ ইবনে আসবাত রহিমাহুল্লাহ বলেন

বলা হয়ে থাকে যে, তুমি ঐ ব্যক্তির ন্যায় আমল করো, যাকে তার আমল ব্যতীত অন্য কিছু নাজাত দিবে না। আর ঐ ব্যক্তির ন্যায় ভরসা করো, যে তার ভাগ্যে নির্ধারিত জিনিস ব্যতীত অন্য কিছুই অর্জন করার আশা করে না।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন

‘‘তোমরা যদি আল্লাহ তা‘আলার উপর পরিপূর্ণরূপে ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদেরকে সেভাবেই রিযিক দিতেন, যেভাবে তিনি পাখিদেরকে রিযিক দিয়ে থাকেন। পাখি খালি পেটে সকালে বাসা থেকে বের হয় আর বিকালে ভরা পেটে ফিরে’’।(11)


তথ্যসূত্র

  1. সূরা মায়িদা: ২৩ ↩︎
  2. সূরা আল মায়িদা: ২৩ ↩︎
  3. সূরা ইউনুস: ৮৪ ↩︎
  4. সূরা আল মুয্যাম্মিল:৯ ↩︎
  5. সূরা তালাক: ৩ ↩︎
  6. সূরা আল মায়িদা: ২৩ ↩︎
  7. সূরা আনফালঃ ২ ↩︎
  8. সূরা আন নিসা: ৭১ ↩︎
  9. সূরা আনফাল: ৬০ ↩︎
  10. সূরা জুমআ: ১০ ↩︎
  11. সহীহ: মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৭০, সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/৪১৬৪। ↩︎

Leave a Reply