শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

সপ্তাহ ৩২: কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

মা ও শিশু

কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

৩২তম সপ্তাহ

সন্তান সৎ ও নেক হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই কিছু বিধিমালা মেনে চলা। সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রুণ অবস্থা থেকে মায়ের যাবতীয় আমল ও আখলাক গর্ভে থাকা সন্তানের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাই এক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর বাবার দায়িত্ব হচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের জন্য হালালভাবে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে পরিবারের ব্যয় বহন করা।
এ ছাড়া আরও কিছু পালনীয় বিষয় হলো
১. সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তার মঙ্গলকামনায় বেশি বেশি দোয়া করা ও আল্লাহর রহমত কামনা করা।
২. প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা।
৩. প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা।
৪. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা।
৫. যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিদিন সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করা।
৬. দান-খয়রাত করা। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।


বিঃ দ্রঃ ছেলে অথবা সবই আল্লাহর দান; আল্লাহ্‌ বলেনঃ “যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।” সূরা শুরাঃ ৪২/ ৪৯-৫০

গর্ভকালীন এ সময়ে ৪ পাউন্ড ওজন আর ৪৩ সেমি দীর্ঘ শিশুটিকে বেশ বড়ই বলা যেতে পারে। এখন থেকে ৩৫ সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে সে ২৫০ গ্রাম করে বাড়বে। জন্মের সময় শিশুটির যে ওজন হবে তার অর্ধেক কিংবা এক তৃতীয়াংশ ওজন আগামী ৭ সপ্তাহের মধ্যে বৃদ্ধি হবে।

শিশুটির মাথা এখন নিচের দিকে নামতে থাকবে, যাতে জন্মের সময় সে জন্মপথ দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। তার ত্বকও এখন আর আগের মতো স্বচ্ছ থাকবে না, বরং অন্য সব নবজাতকের মতোই পুরু থাকবে। বাইরে বেরিয়ে এসে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেবার জন্য তার অন্য যে কাঠামোগুলো ইতিমধ্যে বিকশিত হয়ে যাবে তা হলো হাত ও পায়ের নখ এবং চুল।এই সময় শিশুর শরীর প্রয়োজনীয় খনিজ যেমন, লৌহ, ক্যালসিয়াম শোষণ করতে থাকে ।

এই পর্যায়ে এসে শিশুটির হাড় মজবুত হতে থাকবে। তবে তার মাথার খুলির হাড় এখনো যথেষ্ট নরম আর অসংযুক্ত থাকবে যাতে প্রসবের সময় শিশুটির জন্মপথ দিয়ে বেরিয়ে আসতে সমস্যা না হয়। যদি আপনার প্রসব-যন্ত্রণা দীর্ঘায়িত হয় তাহলে শিশুটি কোণাকার মাথা নিয়ে জন্মাতে পারে। এমন হোলে শিশুটির মাথার খুলির হাড় অনেকদিন পর্যন্ত নরম আর অসংযুক্ত থেকে যাবে। যৌবনের প্রাক্কাল নাগাদ তার মস্তিষ্কের আকার বাড়ার সাথে সাথে এটা ঠিক হয়ে যাবে।

গর্ভকালীন এ সপ্তাহে আপনি
এর আগের কয়েক সপ্তাহ যাবত আপনার জরায়ুর পেশীগুলো প্রচণ্ড টান টান লাগার কথা। ২০তম সপ্তাহ থেকেই হঠাৎ হঠাৎ আপনার জরায়ুর পেশী কুঁচকে যাওয়ার মতো অনুভূতি শুরু হতে পারে, তবে এতে কোনো ব্যথা থাকবে না। এটাকে বলা হয় Braxton hicks contraction ( এটাকে prodromal labour বা practice contractions ও বলা হয়) । কিন্তু যদি পেশীর এই সঙ্কোচনভাব বেশি বেশি হয় এবং সাথে ব্যথাও থাকে, তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ কারণ এটা সময়ের আগেই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

আপনার যোনিপথের স্রাবে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না দেখুন। যদি হঠাৎ করে স্রাবের পরিমাণ বেড়ে যায়, কিংবা স্রাবের সাথে অল্প রক্তও যায় অথবা যদি স্রাবের ধরণ শ্লেষ্মাজাতীয় (mucoid) এবং অতিরিক্ত তরল হয় তাহলে এটা কোনো জটিলতার উপসর্গ হতে পারে। মাসিকের সময় পেটে বা পিঠের নিচের অংশে ( হিপ জয়েন্টে) যেমন ব্যথা হয়, সেরকম ব্যথা হতে পারে আপনার। আসল প্রসব-যন্ত্রণার লক্ষণগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই যদি আপনি এবং আপনার সঙ্গী পড়াশোনা করে ফেলেন, তাহলে আপনাদের জন্যই ভালো হবে। বিশেষ করে এটা যদি আপনাদের প্রথম সন্তান হয়, তাহলে উপসর্গগুলো শুরু হবার সাথে সাথেই আপনারা বুঝতে পারবেন – এখনই সময়!

আগের দুই সপ্তাহ যাবত প্রতি সপ্তাহে আপনার যে আধা কেজি করে ওজন বাড়ছে তার অর্ধেক চলে যাবে গর্ভস্থ শিশুর শরীরে। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছেন তো? গর্ভাবস্থায় সুষম খাবারের অভ্যাস নিয়ে আরো পড়ুন।

পায়ে খিল ধরার অনুভূতিটা এখন আগের চাইতে অসহ্য হয়ে উঠতে পারে। দুই পায়ের ফাঁকে আর পেটের নিচে বালিশ দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন। বুক জ্বালাপোড়া আর দম বন্ধ লাগার সমস্যাও প্রকট হয়ে উঠতে পারে। আপনার এখন ঘন ঘন মূত্র ত্যাগ করার চাপও বেড়ে যাবে।

এতদিনে আপনার স্তন দুধ উৎপাদনের জন্য তৈরি হয়ে যাবে। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন যে আপনার স্তনবৃন্ত গাঢ় বর্ণ ধারণ করবে।আপনার স্তন থেকে এখন অল্প পরিমাণে দুধের মতো তরল ( Pre-Milk/ colostrum) নিঃসৃত হবে। বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য উপযোগী দুধ তৈরি হবার আগে প্রথম কয়েকদিন হলুদ, দুধজাতীয় এই তরল উৎপাদিত হয়। কোনোরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে যাতে পড়তে না হয় সেজন্য ব্রা’র নিচে টিস্যু বা নার্সিং প্যাড এর একটা পরত দিয়ে রাখুন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়তে পারে। এ সময় বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খেতে চেষ্টা করুন। আঁশযুক্ত খাবার আপনাকে এ সপ্তাহে আরো কয়েকটা সম্ভাব্য সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে। যেমন, কোষ্ঠকাঠিন্যের সূত্র ধরে আপনার অর্শের মতো রোগ হতে পারে। অর্শ হচ্ছে গর্ভাবস্থার এমন এক প্রকার সমস্যা যেখানে পায়ুপথের রক্তনালীগুলো একসাথে ফুলে ওঠে। গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যের মাত্রা বেশি হলে এই সমস্যা হতে পারে। আপনার যদি গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয় তাহলে এ পর্যায়ে এসে সমস্যার মাত্রা বাড়তে পারে। এমনকি মলত্যাগের সময় মলের সাথে সামান্য রক্তও যেতে পারে।

আপনার ক্রমবর্ধিষ্ণু শিশুকে জায়গা করে দেয়ার জন্যই আপনার পেটও বিস্তৃত হচ্ছে। পেট বড় হয়ে যাবার কারণে চামড়ায় টান পড়বে আর কিঞ্চিত চুলকানোর মতো অনুভূতিও হতে পারে।

গর্ভকালীন এ সপ্তাহে করনীয়
যদি হাসপাতালে বাচ্চা প্রসব করান তবে আগে থেকেই কাপড়-চোপড়, টাকা-পয়সা, সেবাদানকারীর ব্যবস্থা করে রাখুন। প্রসবব্যথা ওঠার আগে প্রয়োজনীয় টেলিফোন নম্বর সংগ্রহে রাখুন। গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ মনে হয়। তাই এ সময় এমন কিছু করুন যেন একঘেয়েমি না লাগে।

ভাবতে শুরু করুন আপনার বাচ্চার জন্য আপনি কি কি করতে চান। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করুনআপনার আরও সন্তান থাকলে তাদের সঙ্গে সময় কাটান। একই রক্তের গ্রুপসম্পন্ন বন্ধু বা আত্মীয় ঠিক রাখুন যিনি প্রয়োজনে রক্ত দিতে পারবেন।

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

মায়ের খাবার যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নজর রাখতে হবে।এছাড়া মায়ের সারাদিনের খাবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে এসিডিটির ভয় থাকবেনা।

২৮ সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার পর শিশু ক’বার লাথি মারছে সেটা গুনতে শুরু করুন। মনে রাখবেন ২ ঘন্টার মধ্যে যদি শিশু ১০বারের কম লাথি মারে তাহলে অবিলম্বে আপনাকে আপনার চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

অনেকে প্রেগন্যান্সির গোটা সময়টাই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেন। এটা একেবারেই উচিত্ নয়। যদি চিকিত্সক আপনাকে বেড রেস্টে থাকতে না বলেন, এবং অন্য কোনও জটিলতা না থাকে তাহলে সচল থাকুন। বাড়ির হালকা কাজকর্ম করুন। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে যোগাসন বা হালকা ব্যয়াম করুন। সকাল, সন্ধে হাঁটতে যান। এতে ওজন কম থাকবে, শরীর সুস্থ থাকবে, নরমাল ডেলিভারির চান্সও বাড়বে।

যোগব্যায়াম নরমাল ডেলিভারির জন্য অত্যন্ত উপকারী যোগব্যায়াম। এতে শরীরের পেশি শিথিল থাকবে, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমনকী স্ট্রেস কমবে। ডেলিভারির যন্ত্রণা কম করতে তাই নিয়মিত যোগব্যায়াম করুন। তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

Leave a Reply

Close Menu