শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

২৬তম এবং ২৭তম সপ্তাহ: কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

মা ও শিশু

কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

২৬তম এবং ২৭তম সপ্তাহ

সন্তান সৎ ও নেক হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই কিছু বিধিমালা মেনে চলা। সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রুণ অবস্থা থেকে মায়ের যাবতীয় আমল ও আখলাক গর্ভে থাকা সন্তানের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাই এক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর বাবার দায়িত্ব হচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের জন্য হালালভাবে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে পরিবারের ব্যয় বহন করা।
এ ছাড়া আরও কিছু পালনীয় বিষয় হলো
১. সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তার মঙ্গলকামনায় বেশি বেশি দোয়া করা ও আল্লাহর রহমত কামনা করা।
২. প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা।
৩. প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা।
৪. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা।
৫. যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিদিন সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করা।
৬. দান-খয়রাত করা। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।


বিঃ দ্রঃ ছেলে অথবা সবই আল্লাহর দান; আল্লাহ্‌ বলেনঃ “যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।” সূরা শুরাঃ ৪২/ ৪৯-৫০

২৬ ও ২৭তম সপ্তাহে আপনার শিশুর ওজন ৬০৩.২ গ্রাম থেকে ৯০৭.১ গ্রাম এর মধ্যে হয় এবং তার পরিমাপ ১৪-১৪.৫ ইঞ্চি হয়। আপনার গর্ভে যদি পুত্র সন্তান হয় তাহলে, এখন তার শুক্রাশয় তার অণ্ডথলির মধ্যে নামতে শুরু করেছে। আপনার সন্তান এখন নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে ঘুমোবে এবং জাগবে, সে এখন তার চোখ খুলতে এবং বন্ধ করতে পারবে এমনকি সে এখন সম্ভবত তার আঙ্গুলও চুষতে পারবে। তার মস্তিষ্কের টিস্যু আরো উন্নয়নশীল হওয়ার ফলে আপনার শিশুর মস্তিষ্ক এখন খুব সক্রিয় হবে।

ষড়বিংশ সপ্তাহ
আপনার শিশুর শ্রবণশক্তি এখন সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে গেছে। শিশু এখন আশেপাশের আওয়াজে সাড়া দিলে তার নাড়ির স্পন্দন বেড়ে যায়। এমনকি শিশু সঙ্গীতের তালে তালে নড়তেও পারে। তার ফুসফুস বর্ধনশীল হলেও কিন্তু এখনো পরিপক্ক হয়নি। আপনার শিশুর মস্তিষ্ক তরঙ্গের প্যাটার্ন একটি পূর্ণ-মেয়াদী নবজাতকের মতই প্রদর্শিত হবে। তার ঘুমের এবং জেগে থাকারও একটা প্যাটার্ন তৈরী হয়ে গিয়েছে। এই সপ্তাহটি আপনার শিশুর কান ও চক্ষুর বিকাশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আপনার বাচ্চার শ্রবণতন্ত্রের (কর্ণের ভাগ ও পেরিফেরাল সংজ্ঞাবহ শেষ অঙ্গ) বিকাশ যা তার অষ্টাদশ সপ্তাহ থেকে শুরু হয়েছিল, এখন তা সম্পূর্ণভাবে গঠিত হয়ে গেছে, এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আপনার শিশু ক্রমশ শব্দের প্রতি আরো বেশী সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। আগামী একমাসের মধ্যে আপনি বুঝতে পারবেন যে হঠাৎ কোনো জোরালো শব্দে শুনলে সে আপনার গর্ভে লাফিয়ে উঠছে। যে কোন শব্দ আপনার জরায়ুতে সহজেই অতিবাহিত হয় যা তার শ্রবণেন্দ্রি়য়ের বিকাশে সাহায্য করে। আপনার শিশুর চোখ এখন প্রায় সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে গেছে। আপনি কি জানেন যে গর্ভে থাকাকালীন সব শিশুর চোখ তাদের জিনগত উত্তরাধিকার নির্বিশেষে নীল রঙের হয়? একটি শিশুর চোখ তার জন্মের কয়েক মাস পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত রঙ পায় না। শিশুর ফুসফুসের বায়ু থলি যাকে অ্যালভিয়োলি বলা হয়, তা এই সপ্তাহের শেষে বিকশিত হয়ে যাবে এবং সারফ্যাকট্যান্ট নামক একটি পদার্থ যা ফুসফুসের টিস্যুকে একসাথে লেগে থাকার থেকে বাঁচায়, সেটি নিঃসৃত হতে আরম্ভ করবে।

ষড়বিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
এখন আপনার শিশুর অবিরত নড়াচড়া একটি ভালো লক্ষণ বলা যেতে পারে। আপনি এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪৫৪ গ্রাম হারে ওজন বৃদ্ধি করবেন। আপনার শিশুর বৃদ্ধি আপনার পাঁজরের খাঁচা উপরের দিকে ঠেলে দেবে যার ফলে আপনি পাঁজরে ব্যথা বোধ করতে পারেন। এই উর্ধ্বগামী চাপ বদহজম এবং অম্বলের কারণ হয়েও দাঁড়াতে পারে। এছাড়াও শরীরে কোথাও সেলাই হলে যে যন্ত্রনা হয় সেরকম ব্যথা আপনি আপনার পেটের পাশ থেকে শুরু করে আপনার জরায়ুজ পেশী পর্যন্ত অনুভব করতে পারেন। এছাড়াও এই সময় আপনার গ্রন্থির শিথিলতা, ভরকেন্দ্রের স্থানান্তর এবং বাড়তে থাকা ওজনের কারণে আপনার পা ফসকানোর, হোঁচট খাওয়ার এবং অন্য সময়ের চেয়ে বেশী পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যদিও এই জবড়জং ভাব সাময়িক, কিন্তু আপনার ও আপনার সন্তানের সুরক্ষার জন্য আপনাকে এখন বাথটব, শাওয়ার এবং অন্যান্য পিচ্ছিল জায়গায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ষড়বিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
আপনি যদি কর্মরত হন এবং সন্তানের জন্মের পর আপনাকে কাজ যোগ দিয়ে হয় তাহলে আপনি এখন থেকে আপনার এলাকায় চাইল্ড কেয়ার সেন্টারগুলি কি ধরণের সার্ভিস দিতে পারবে তার খোঁজ নেওয়া শুরু করে দিন। এখন আপনার শিশু আপনার গর্ভে লাথি মারা শুরু করে দিয়েছে নিশ্চয়? আসলে তার এই আন্দোলন তার বড় হয়ে হাঁটতে শুরু করার এক অনুশীলন বলা যেতে পারে। আপনার শিশুর স্নায়ুতন্ত্র যত উন্নত হতে থাকবে ততো ভ্রূণের আন্দোলন সমন্বিত হতে থাকবে। শিশু যতো বড়ো এবং শক্তিশালী হতে থাকবে তার পদাঘাতও আরো জোরালো হয়ে উঠবে এমনকি মাঝে মাঝে তা আপনার জন্য বেদনাদায়ক হয়ে উঠতে পারে। তাই পরের বার শিশু পায়ের আন্দোলন করলে আপনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন বা আপনার হাত, পা টানটান করার চেষ্টা করতে পারেন। এছাড়াও আপনি আপনার হাত দিয়ে আলতো করে আপনার শিশুকে ঠেলা দিতে পারেন যাতে সে তার অবস্থান পরিবর্তন করে।

সপ্তবিংশ সপ্তাহ
সপ্তবিংশ সপ্তাহে আপনার শিশুর হাত সক্রিয় হয়ে উঠবে। শিশু নিজের বুড়ো আঙুলের চুষতে শুরু করবে যা তাকে শান্ত রাখতে এবং তার গাল ও চোয়ালের পেশী মজবুত করতে সাহায্য করবে। এই সপ্তাহে আপনার শিশু এখন কান্নাকাটি করতে সক্ষম হয়ে উঠেছে। কোন কারণে যদি আপনার শিশুর এখন প্রিম্যাচিওর বার্থ হয় তাহলে তার জীবিত থাকার সম্ভাবনা হবে ৮৫%। শিশু এখনও পুরোপুরি গঠিত হয়নি এবং সম্ভবত নিজে শ্বাস নিতে সক্ষম হবে না। এই সপ্তাহে ভূমিষ্ঠ বাচ্চাকে ইনকিউবেটরে রেখে তার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করতে হবে, এবং তার যকৃত এবং ইমিউন সিস্টেম – দুই-ই দুর্বল হবে। শিশুর জন্মের সময় তার জিহ্বায় স্বাদ কুঁড়ি তার পরবর্তী জীবনের তুলনায় বেশী থাকে যার ফলে একটি নবজাতক শিশু অনায়াসে তার মায়ের বুকের দুধ এবং অন্য কারো দুধের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।

সপ্তবিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
এই সময়টাতে আপনার গ্যাসের সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। তাই এই সমস্যা প্রশমিত করতে আপনি ব্রোকলি এবং শতমূলীর মত খাদ্য যা পেট-ফাঁপা এবং বারংবার বাতকর্মের ইচ্ছা ঘটাতে দায়ী সেগুলির বদলে পালংশাক এবং গাজর খাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এখনই সঠিক সময় যখন আপনি আপনার ডাক্তার বা ধাত্রীর সাথে কথা বলে সন্তান প্রসবের ব্যাপারে সব কিছু জেনে নিতে পারেন। তারা আপনাকে প্রসবের লক্ষণ বুঝতে ও কতটা সময় বাদে বাদে সংকোচন হলে পরে হাসপাতাল বা জন্ম কেন্দ্রে যাওয়া উচিত সে সম্পর্কে বুঝিয়ে দেবেন। এছাড়া কোন শিশু বিশেষজ্ঞকে দিয়ে আপনার শিশুর চিকিৎসা করাবেন, কোথায় আপনি সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, সেখানে রেজিসট্রেশান করা ইত্যাদির ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিতে পারেন। আপনার মেডিকাল রেকর্ডে এই প্ল্যান লেখা থাকবে বা জন্ম পরিকল্পনা ফর্মের সঙ্গে এটি সংযুক্ত করা হবে।

সপ্তবিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
আপনার জরায়ু ক্রমশ প্রসারিত হওয়ার ফলে আপনার শরীরে স্ট্রেচ মার্কস বেড়ে গেছে। এই সময় বেশীর ভাগ মহিলাদের ওজন-ই ৭-৯ কেজি বেশী বৃদ্ধি পায়। আপনি এখন যত আয়তনে বাড়তে থাকবেন আপনার ব্যালেন্স এবং গতিশীলতারও পরিবর্তন ঘটতে থাকবে। এখন আপনার পায়ের জুতো বা হাতের আংটি আঁটো লাগলেও মনে রাখবেন যে এই স্ফীতি কিন্তু সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক এবং সাময়িক। কিন্তু যদি এই স্ফীতি অত্যধিক বলে মনে হয়, তাহলে আপনার চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন কারণ এটি প্রি-এক্লামশিয়া লক্ষণও হতে পারে । যদিও প্রিক্ল্যাম্পসিয়া হলে তখন হাই ব্লাড প্রাসার ও মূত্রে প্রোটিনের মত অন্যান্য উপসর্গও হবে। যদি আপনি এই আনুষাঙ্গিক উপসর্গের সম্মুখীন না হয়ে থাকেন তাহলে আপনার চিন্তা করার কিছুই নেই। এই স্ফীতি থেকে আরাম পাওয়ার উপায় হল দীর্ঘ সময়ের জন্য ঠাঁয় বসে বা দাঁড়িয়ে না থাকা, চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে সাঁতার বা হাঁটার মত কিছু গর্ভাবস্থা-উপযুক্ত ব্যায়াম করার চেষ্টা করা এবং ঘুমানো বা বসার সময় পা কিছুর ওপর তুলে রাখা। প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান করুন। মনে রাখবেন পানি সেবন সীমাবদ্ধ করলে নয় বরং নিজেকে জলয়োজিত রাখলে তবেই স্ফীতি হ্রাস পাবার সম্ভাবনা থাকবে।

আল্লাহই সবচেয়ে ভাল জানেন | তথ্যসূত্রঃ WebMD

Leave a Reply

Close Menu