শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

২৩,২৪ ও ২৫তম সপ্তাহ : কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

মা ও শিশু

কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

২৩তম ২৪তম এবং ২৫তম সপ্তাহ

সন্তান সৎ ও নেক হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই কিছু বিধিমালা মেনে চলা। সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রুণ অবস্থা থেকে মায়ের যাবতীয় আমল ও আখলাক গর্ভে থাকা সন্তানের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাই এক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর বাবার দায়িত্ব হচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের জন্য হালালভাবে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে পরিবারের ব্যয় বহন করা।
এ ছাড়া আরও কিছু পালনীয় বিষয় হলো
১. সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তার মঙ্গলকামনায় বেশি বেশি দোয়া করা ও আল্লাহর রহমত কামনা করা।
২. প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা।
৩. প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা।
৪. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা।
৫. যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিদিন সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করা।
৬. দান-খয়রাত করা। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।


বিঃ দ্রঃ ছেলে অথবা সবই আল্লাহর দান; আল্লাহ্‌ বলেনঃ “যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।” সূরা শুরাঃ ৪২/ ৪৯-৫০

সপ্তাহ ২৩,২৪ ও ২৫শে আপনার শিশুর দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ১১ থেকে ১৩ ইঞ্চির মধ্যে আর তার ওজন প্রায় ৪৫৩.৫ গ্রাম থেকে শুরু করে ৬৮০.৩ গ্রামের মতো। এখন আপনার সন্তান দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ দ্রুত ওজন বৃদ্ধি করতে থাকবে। যদিও তার চোখ গঠিত হয়ে গেছে কিন্তু তার কোষসমূহের স্বাভাবিক রঞ্জন এখনও হবেনা। আপনার গর্ভের ভ্রূণের ঘুমের/নিদ্রাভঙ্গের একটি প্যাটার্ন তৈরী হতে শুরু করবে। তার মাথায় এখন লাঙ্গুও(languo) নয় বরং আসল চুল গজাতে শুরু করবে।

ত্রয়োবিংশ সপ্তাহ
আপনার শিশুর ত্বক এখনও কুঞ্চিত হয়ে আছে কারণ আপনার শিশু এখনও আরও ওজন লাভ করবে। যেহেতু তার গাত্রবর্ণ তার চর্বির তাই এখন আপনার শিশুর চামড়া ঝুলে থাকবে – তবে শীঘ্রই তার চর্বি জমতে থাকবে এবং সমস্ত কিছু পূরণ হয়ে তার কাঠামোর সাথে সমন্বয়সাধন ঘটবে । যদিও আপনি এখন ২৩ সপ্তাহের গর্ভবতী, কিন্তু আপনার শিশুর অঙ্গ ও হাড় তার চামড়ার (যা উন্নয়নশীল শিরা এবং ধমনীর জন্য লালচে দেখতে লাগছে) মাধ্যমে দৃশ্যমান। তবে তার শরীরে একবার যখন চর্বি স্থায়ীভাবে জমে যাবে তখন তার ত্বকও অসচ্ছ হয়ে যাবে।

ত্রয়োবিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
আপনি এখন সম্ভবত ৫–৭ কেজি ওজন অর্জন করে ফেলেবেন। গর্ভবতী অবস্থায় আপনি যোনি নিঃসরণে বৃদ্ধি খেয়াল করতে পারেন। সাধারণত, এটি হাল্কা গন্ধযুক্ত এবং স্বচ্ছ বা হরিদ্রাভ রঙের হয়; তবে রং বা গন্ধে কোন উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকলে আপনি আপনার চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করে কোন সংক্রমণ হয়েছে কিনা জেনে নিন। আপনার পিঠে কি এখন ব্যথা হচ্ছে? তাহলে শায়িত থেকে, ম্যাসেজ করে এবং একটি হিটিং প্যাড বা গরম পানির বোতল ওই ব্যাথার জায়গায় রাখলে আরাম পাবেন। সব সময় আপনার পাশে এক বোতল পানি রাখুন। জলয়োজিত থাকা আপনার অতিরিক্ত রক্তের ​​ভলিউম বজায় রাখতে সাহায্য করে, অ্যামনিয়োটিক তরলের পুনর্নবীকরণ ঘটায় এবং আপনার স্তনে মাতৃদুগ্ধের উৎপাদন করতে সাহায্য করে।

ত্রয়োবিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
আপনার ত্বক ক্রমশঃ প্রসারিত হওয়ার ফলে তা শুষ্ক এবং রুক্ষ হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে বডি লোশন বা বডি অয়েলের ব্যবহার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। ৭৫%-এরও বেশি গর্ভবতী মহিলারা এইসময়ে অনিদ্রায় ভোগেন। সেক্ষত্রে আপনি আপনার পায়ের মাঝখানে একটি বালিশ রেখে এবং আপনার হাঁটু ভাঁজ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে পারেন।

চতুর্বিংশ সপ্তাহ
আপনার শিশুর রক্তের শ্বেতকণিকা, যা রোগ এবং সংক্রমণ বন্ধ করতে সাহায্য করে, তার গঠন এই সপ্তাহে শুরু হয়ে যাবে এবং আপনার শিশু আপনার স্পর্শ বা গলার আওয়াজে সাড়া দিতে সক্ষম হবে। এখন শিশুর ওজন বৃদ্ধির অনেকটাই তার অঙ্গ, হাড়, পেশি এবং জমতে থাকা শিশুর চর্বি থেকে আসে। আপনার সন্তানের মুখমন্ডল যদিও এখনো ছোট কিন্তু সেটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয়ে গেছে, তার চোখের পাতা, ভ্রু এবং চুলের বিকাশ এখন সম্পূর্ণ। তবে এই মুহূর্তে তার চুলে কোন রঙ্গক না থাকার ফলে তার চুল এখন সম্পূর্ণ সাদা থাকে।

চতুর্বিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
আপনার চিকিৎসক এই সপ্তাহ থেকে ২৮ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভাবস্থার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে পারেন। এখন আপনি আপনার কবজি এবং আঙ্গুলে অস্বস্তিকর রণন এবং অসাড়তা লক্ষ্য করবেন যা সাধারণত পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ যেখানে হাতের গতি প্রয়োজন যেমন টাইপিং ইত্যাদির কারণে হয় । আবার এটি কারপাল টানেল সিনড্রোমের কারণেও হতে পারে যা একদম ভিন্ন কারণে গর্ভবতী মহিলাদের আক্রান্ত করে । গর্ভাবস্থায় এই স্ফীতির কারণ হল আপনার শরীরে জমতে থাকা তরল যা দিনের বেলায় আপনার পায়ের নিম্নভাগে জমে এবং যখন আপনি শুয়ে থাকছেন তখন সেটি পুনরায় আপনার হাত সহ আপনার সারা শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে আপনার কব্জি মধ্য দিয়ে যে নার্ভ গেছে তার উপর চাপ নির্বাণ করে। এর ফলে অসাড়তা, রণন, ব্যথা বা একটা চাপা ব্যথা আঙ্গুলে, হাতে বা কব্জির মধ্যে ঘটায়। এই অস্বস্তি এড়াতে আপনি রাতে ঘুমবার সময় হাতের উপর ভর করে ঘুমনোর থেকে নিজেকে ব্যাহত রাখুন এবং আপনার হাতের ভার একটি বালিশের ওপর রেখে ঘুমনোর চেষ্টা করুন। হাত ও কবজি ঝাঁকালেও আরাম পেতে পারেন। যদি আপনাকে পিয়ানো বাজানো বা টাইপিং এই ধরনের কাজ (যেটা আপনার উপসর্গ বাড়িয়ে পারে) করতে হয় তাহলে মাঝে মাঝেই হাতে প্রসারিত করুন ও বিরতি নিন।

চতুর্বিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
এখন আপনার স্বামী/সঙ্গী আপনার পেটের ওপর কান রেখে শিশুর হৃত্স্পন্দন শুনতে সক্ষম হতে পারেন। এই সপ্তাহে আপনার জরায়ু ক্রম প্রসারিত হওয়ার ফলে যে লিগামেন্ট এই প্রসারণকে আলম্বন জোগায় সেখানে আপনি ব্যথা অনুভব করতে পারেন। তাই একটানা কোন কাজ না করে বারেবারে বিরতি নিন। এখন মাঝে মধ্যে তলপেটে হাল্কা ব্যাথা হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু যদি তার সাথে কোনরকম অস্বস্তি যেমন জ্বর, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা রক্তপাতের মত উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে অবিলম্বে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এই দিনগুলিতে আপনার হাতের পাতা লাল হয়ে চুলকুনি হতে পারে যা আপনার পায়ের পাতাতেও ছড়িয়ে পরতে পারে। এই ধরনের লাল হয়ে চুলকুনি থামাতে দীর্ঘসময় ধরে গরম জলে স্নান করা বা খুব–উষ্ণ বা খুব টাইট গ্লাভস বা মোজা পরা, এমনকি বাসন মাজা এড়িয়ে চলুন। দিনে একবার ঠান্ডা জলে হাত এবং / অথবা পায়ের পাতা ভিজিয়ে রাখলে বা কয়েক বার কয়েক মিনিটের জন্য একটি বরফ প্যাক প্রয়োগে করলে এর থেকে ত্রাণ পাবেন।

পঞ্চবিংশ সপ্তাহ
আপনার শিশুর ত্বক এখন আগের মতো স্বচ্ছ থাকার পরিবর্তে অস্বচ্ছ হতে শুরু করবে। যেহেতু তার চামড়ার এখনও তৈরী হত্তয়া বাকি আছে শিশুর শরীর এখনও পরতে ঢাকা। শিশুর অবস্থানের উপর নির্ভর করে এখন একটি স্টেথিস্কপের মাধ্যমে বা আপনার উদরে কান রাখলে শিশুর হৃদস্পন্দন শোনা যাবে। আপনার শিশু এখন স্পর্শ করতে পারে, তার পা ধরে রাখতে পারে এবং হাত মুঠ করতেও পারে। আপনার শিশুর এখন একটি সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় সময়সীমার মধ্যে নিয়মিত ঘুমের সময়সূচী তৈরী হয়ে গেছে। আপনি ঐ সময়সীমা উপলব্ধি করতে সক্ষম হতেও পারেন আবার নাও পারেন। আপনার শিশুর নাসারন্ধ্র, যা আগে বন্ধ ছিল, তা এখন খুলে গেছে।

পঞ্চবিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
আপনার জরায়ু এখন ওপরদিকে মুখ করে বাড়ছে এবং এই বৃদ্ধি আপনার পেটের পক্ষে বড় হচ্ছে এমনও হতে পারে। আপনার রক্ত ​​প্রবাহের বৃদ্ধির ফলে অর্শ্বরোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, এবং অম্বলের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য, পাইলস হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয় তাই সেটিকে প্রতিরোধ করতে হলে আপনাকে তরল এবং ফাইবারের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে এবং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার যেমন ফল, সবজি এবং শস্য প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে। শ্রোণীর ব্যায়াম (Kegels) করলে, বরফের প্যাক ব্যবহার করলে এবং মলত্যাগ করার সময় অতিরিক্ত চাপ না দিলেও আপনি এই অস্বস্তির হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

পঞ্চবিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
অর্শ্বরোগ প্রশমিত করার জন্য বরফ প্যাক ব্যবহার করুন অথবা অগভীর গরম পানিতে আপনার নিতম্ব ভেজানোর চেষ্টা করুন। ওভার–দ্য–কাউন্টার সাপোজিটার অথবা ঔষধমিশ্র টিস্যুও ব্যবহার করতে পারেন। কিন্তু জোলাপ বা খনিজ তেল গ্রহণ করবেন না। আপনি যদি শ্রোণী এলাকায় বেদনা বোধ করে থাকেন তাহলে হতে পারে আপনি এসপিডি অনুভব করছেন যা আপনার প্রসারপ্রবণ লিগামেন্ট যেটি সাধারণত আপনার শ্রোণীর জয়েন্টগুলোকে (symphysis pubis) প্রান্তিককৃত রাখে, তার দ্বারা সৃষ্ট। আপনি কেজেল(Kegel) ব্যায়াম এবং শ্রোণী টিল্ট প্র্যাকটিস করুন যা পেলভিক অঞ্চলের পেশীকে শক্তিশালী করবে। যদি ব্যথা তীব্র হয়, তবে আপনার চিকিৎসককে অনুরোধ করতে পারেন ফিজ়িও থেরাপিস্টের রেফারেল আপনাকে দেওয়ার জন্য।

আল্লাহই ভাল জানেন | তথ্যসূত্রঃ WebMD

Leave a Reply

Close Menu