শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

২১তম ও ২২তম সপ্তাহ : কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

মা ও শিশু

কেমন কাটবে আপনার গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

২১তম এবং ২২তম সপ্তাহ

সন্তান সৎ ও নেক হওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে, সন্তান মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই কিছু বিধিমালা মেনে চলা। সন্তান যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন ভ্রুণ অবস্থা থেকে মায়ের যাবতীয় আমল ও আখলাক গর্ভে থাকা সন্তানের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। তাই এক্ষেত্রে গর্ভবতী মায়ের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, গোনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর বাবার দায়িত্ব হচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের জন্য হালালভাবে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে পরিবারের ব্যয় বহন করা।
এ ছাড়া আরও কিছু পালনীয় বিষয় হলো
১. সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় তার মঙ্গলকামনায় বেশি বেশি দোয়া করা ও আল্লাহর রহমত কামনা করা।
২. প্রতিদিন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা।
৩. প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর এবং রাতে ঘুমানোর পূর্বে ১১ বার সূরা ইখলাস পাঠ করা।
৪. প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠ করা।
৫. যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিদিন সূরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করা।
৬. দান-খয়রাত করা। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা।


বিঃ দ্রঃ ছেলে অথবা সবই আল্লাহর দান; আল্লাহ্‌ বলেনঃ “যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন।” সূরা শুরাঃ ৪২/ ৪৯-৫০

সপ্তাহ ২১ ও ২২–এ আপনার শিশুর ওজন ৩৪০.১৯৪ গ্রাম থেকে শুরু করে ৪৫০ গ্রামের কাছাকাছি হয় এবং তার দৈর্ঘ্য ১০.৫ ইঞ্চি থেকে ১১ ইঞ্চির মধ্যে থাকে। এই সপ্তাহগুলিতে শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এখন থেকে আপনাকে দেখে বোঝা যাবে যে আপনি গর্ভবতী।

একবিংশ সপ্তাহ
আপনার শিশুর বৃদ্ধির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তার ওজন–বৃদ্ধি, এখন পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে। সে এখন নিয়মিতভাবে জলয়োজন এবং পুষ্টির জন্য অ্যামনিয়োটিক তরল পান করছে, তরলের মধ্যে প্রস্রাব করছে এবং নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে (সৌভাগ্যবসত, এই অ্যামনিয়োটিক তরল পুকুর নিজেই প্রতি তিন ঘণ্টা রিফ্রেশ হতে থাকে)। একবিংশ সপ্তাহে আপনার শিশুর ভ্রু এবং চোখের পাতা সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে যায়। স্বাদ–কুঁড়ি (টেস্ট–বাড্) তার জিহ্বার উপর বিরচন করতে শুরু করে। যদিও তার চোখের পাতা এখনও সেঁটে আছে কিন্তু তার চোখ এখন পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন আপনার শিশুর শরীর যাতে উষ্ণ থাকে তার জন্য তার দেহে ক্রমান্বয়ে চর্বি/ফ্যাট জমতে থাকে। যদিও শিশুর বৃদ্ধির হার আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে, কিন্তু তার অঙ্গ–প্রত্যঙ্গের পূর্ণ বৃদ্ধি এখনও বর্তমান। এই সপ্তাহে আপনার শিশুর তৈল–গ্রন্থি ভার্নিক্স ক্যাস্যোসা নামক একটি চটচটে, মোমের মতো আচ্ছাদন উৎপাদন করে যাতে ওর ত্বক আ্যমনিয়োটিক তরলের মধ্যে থাকাকালীন কোমল থাকে। আপনার শিশুর বয়সকালের স্থায়ী দাঁতের প্ররোহ এখন থেকেই গঠিত হতে শুরু করে।

একবিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
এখন আপনাকে দেখলে বোঝা যাবে যে আপনি মা হতে চলেছেন। আপনার জরায়ু আপনার নাভির উপরে প্রসারিত হতে শুরু করেছে। আপনার ওজন ৪–৬ কেজি বৃদ্ধি পেয়েছে। যদি গর্ভাবস্থার শুরুতে আপনার খাদ্যের প্রতি অনীহা থেকে থাকে তাহলে এখন থেকে আপনার খাদ্যের প্রতি রূচি ফিরতে শুরু করবে । সবসময় কিছু খেতে ইচ্ছে করলে নিজের কাছে পুষ্টিকর স্ন্যাকস্ যেমন বাদাম, কিশমিশ, ট্রেইল মিক্স বা গ্র্যানোলা বার রাখুন যাতে কর্মরত বা ভ্রমণরত অবস্থাতেও আপনার শরীর আপনার এবং আপনার শিশুর পুষ্টিসাধন করবার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর জ্বালানি সরবরাহ করতে পারে। যেহেতু এখন আপনার শরীরে গর্ভবতী হওয়ার আগের তুলনায় প্রায় ৫০% বেশি রক্ত ​​ও তরল বয়ে চলেছে, তাই এখন আপনার পা ফুলে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরী হতে পারে। তাই সারা দিন একটানা বসে থাকবেন না, দিনে কয়েকবার বসা–দাঁড়ান প্র্যাকটিস করুন।

একবিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
যদি আপনি প্রসবকালীন শিক্ষা নেওয়ার ক্লাসে যোগ দিতে আগ্রহী হন, তাহলে এখনই সেটি খুঁজতে শুরু করার জন্য সঠিক সময়। এখন আপনি শরীরচর্চা করলেও হাল্কা এক্সারসাইজ যেমন সাঁতার, যোগব্যায়াম বা হাঁটা ইত্যাদি অল্প ধকলের অনুশীলন করবেন কারণ যেহেতু আপনার শরীরের সন্ধিবন্ধনী বা লিগামেন্ট শিথিল হয়ে আছে তাই আপনার আঘাত লাগার বা আহত হওয়ার সম্ভাবনা আগের তুলনায় এখন বেশী হবে ।

দ্বাবিংশ সপ্তাহ
আপনার শিশু এখন তার অস্তিত্বের পঞ্চম মাসে প্রবেশ করেছে। তার হাত ও পায়ের নখ এখন প্রায় সম্পূর্ণ আকার ধারণ করেছে এবং তার দৈহিক গঠনতন্ত্র অনেক বেশি কার্যকরী এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। শিশুর এখন একজোড়া স্বতন্ত্র অধর তৈরী হয়ে গেছে এবং তার প্রথম শ্বাদন্ত এবং চর্বণদন্ত তার মাঢ়ীর রেখার নিচে বিকশিত হতে শুরু করে দিয়েছে। এই সপ্তাহে আপনার শিশুকে আর ভ্রূণ নয় বরং একটি ক্ষুদ্র নবজাতকের মত দেখতে লাগে। দ্বাবিংশ সপ্তাহে আপনার নাভিরজ্জুর মাধ্যমে রক্ত প্রবাহ ৬.৪ কি.মি প্রতি ঘন্টা বেগে ধাবিত হচ্ছে যা শিশুকে অক্সিজেন এবং পুষ্টি যুগিয়ে তার বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। এখন সপ্তাহে সপ্তাহে আপনার শিশুর পেশী শক্তিশালী হতে শুরু করেছে, এবং চোখের পাতা ও ভ্রু বিকশিত হতে শুরু করেছে। আপনার শিশু এখন থেকে অনেক বেশী নড়াচড়া করবে এবং তাল, সুর ও শব্দের বদলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারবে। আপনি এখন কোন গান গাইলে বা আপনার শিশুর কথা বলতে থাকলে, আপনার গলার স্বর আপনার নবজাতকের জন্মের পর তাকে প্রশমিত করতে সাহায্য করবে।

দ্বাবিংশ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
আপনার জরায়ু এখনও বাড়লেও মর্ণিং সিকনেস বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আপনি এখন সম্ভবত অনেক ভালো বোধ করবেন। তবে আপনার পায়ে এখনও শিরটান ধরার এবং আপনার গোড়ালি ও পায়ের পাতা হালকা ফুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আপনার পায়ে যদি কখনও শিরটান লেগে যায় তবে তার থেকে পরিত্রাণ পেতে আপনার পা সোজা রেখে পায়ের আঙ্গুল আপনার দিকে ফিরিয়ে আস্তে আস্তে ফ্লেক্স করতে চেষ্টা করুন। দ্বাবিংশ সপ্তাহ থেকে এক্স–রে, সেলফোন ও অন্যান্য হাইটেক গ্যাজেট থেকে নির্হিত রশ্মির অদেখা বিপদ থেকে আপনার শিশুকে রক্ষা করার উপায় জেনে নিন। আপনার ক্রমবিস্তৃত জরায়ু আপনার রক্তনালীসমূহের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে আপনার মস্তিষ্কে রক্ত ​​প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং আপনার মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘোরা ইত্যাদি উপশম দেখা দিতে পারে। আপনার সংবহনতন্ত্রে রক্তপ্রবাহ বজায়শিরটান রাখতে দিনে অন্তত আট গ্লাস পানি (গরমকালে বা শরীরচর্চা করার সময় আরো বেশী পরিমাণ) পান করুন।

দ্বাবিংশ সপ্তাহের জন্য যত্ন
এইসময় শিরটান বা পায়ে খিল লাগা প্রশমিত করতে আপনাকে বেশী পরিমাণে ক্যালসিয়াম এবং পটাসিয়াম খেতে হবে। রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস দুধ পান করুন এবং জলখাবারে আঙুর, কমলালেবু, এবং কলাজাতীয় পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান। এখন হয়ত আপনি আপনার পেট, নিতম্ব, উরু এবং বুকে স্ট্রেচ মার্কস দেখতে পাবেন। এর জন্য আপনি সমস্ত শরীরে ময়েশ্চারাইজার বা বডি অয়েল মালিশ করতে পারেন – যদিও এটা অলৌকিকভাবে কোন প্রতিকারও নাও করতে পারে, কিন্তু আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন এবং এই মালিশ আপনাকে শুষ্ক ত্বক এবং চুলকানি থেকে আরাম পেতে সাহায্য করবে।

আল্লাহই ভাল জানেন; | তথ্যসূত্রঃ WebMD

Leave a Reply

Close Menu