25/07/2020 By Ontor Bin Aiyub Madbor 0

অনুবাদকের কথা

চকচক করলেই সোনা হয় না। সোনা চেনা দায়। সোনা চিনতে কষ্টিপাথর কিনে তাতেও যদি ভেজাল থাকে তাহলে আরো বড় দায়। কুরআন-হাদীসের কষ্টিপাথরে ভুল বুঝ ও ব্যাখ্যার ভেজাল থাকলে সত্যই যে সংকটাবর্তের সৃষ্টি হয় তা ফিৎনা ছাড়া আর কি? ব্যবসা মাত্রেই হালাল নয়। হারাম বস্ত্তর ব্যবসা, হারাম মিশ্রিত বা সন্দিগ্ধ ব্যবসা তথা হারাম উপায়ে ব্যবসা অবশ্যই হারাম। আর যা হারাম তার সহায়তা করাও হারাম।

আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلا تَعَاوَنُوا عَلَى الْأِثْمِ وَالْعُدْوَانِ﴾

অর্থাৎ, তোমরা সৎ ও আল্লাহভীরুতার কাজে একে অন্যের সহায়তা কর এবং পাপ ও অন্যায় কাজে পরস্পরকে সাহায্য করো না। (সূরা মাইদাহ ২ আয়াত) আর আল্লাহর রসূল (সাঃ) যেমন মদখোর ও সূদখোরকে অভিশাপ করেছেন তেমনি অভিশাপ করেছেন তার কোন প্রকার সহায়ককেও।

সুতরাং হারাম ব্যবসায় পুঁজিবিনিয়োগ করাও হারাম। যেহেতু ব্যাংকের ব্যবসা সূদী ব্যবসা; না মানলেও সন্দিগ্ধ ব্যবসা নিশ্চয়ই। ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে শোষণ না করলেও পরোক্ষভাবে করে। সকলের জানতে না করলেও অজানতে করে।

মুশরিকদের নিকট কিছু বৈধ জিনিস ক্রয় করা বা উপঢৌকন গ্রহণ করা বৈধ হলেও তাদের নিকট থেকে হারাম জিনিস যেমন মদ, শুকরের গোশত তাদের যবেহকৃত গোশত প্রভৃতি ক্রয় করা বা উপঢৌকন গ্রহণ করা অবশ্যই হালাল নয়।

স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সন্তষ্টিচিত্তে কেউ যদি অবৈধ মাল বা চুরির মাল দেয়, তবে জেনেশুনে তা গ্রহণ করা কি বৈধ? একদা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর এক ক্রীতদাস তার জাহেলিয়াতে ভাগ্যগণনার বাকী থাকা পারিশ্রমিক আদায় পেলে তা থেকে আবু বকর (রাঃ) ভক্ষণ করে ফেললেন এবং পরে জানতে পেরে তিনি সমস্ত খাদ্য বমি করে ফেললেন।[1]

কারণ, নবী (সাঃ) বলেন,

كُلُّ لَحْمٍ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ فَالنَّارُ أَوْلَى بِهِ.

‘‘যে গোশত হারাম খাদ্য দ্বারা তৈরী হয় তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।’’ অতএব কেউ খুশী করে দিলেও হারাম বা সন্দিগ্ধ মাল ভক্ষণ না করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য নয় কি? আল্লাহর বাণী ‘‘আর তোমরা পাপ ও অন্যায় কর্মে পরস্পরকে সহায়তা করো না।’’ অতএব এই বাণী মাথায় নিয়ে জেনে শুনে হারাম ব্যবসায়ীকে ঋণ দেওয়া নিশ্চয় বৈধ হবে না। আর বাধ্য হয়ে দিতে হলেও সেই ঋণের টাকায় ব্যবসাকৃত লাভ (?) এর ভাগ নেওয়া বৈধ কি রূপে হতে পারে? তা ছাড়া সাধারণ দান এবং ঋণদানের উপর কিছুর প্রতিদান দেওয়ার মাঝে বড় পার্থক্য আছে। ব্যাংকের দেওয়া সূদ যদি সাধারণ দানের পর্যায়ভুক্ত হয় তাহলে শতশত গরীব-দুঃস্থ, অনাহারে ধূলালুণ্ঠিত পথের ভিখারীদেরকে ব্যাংক কেন তার সেই এহসানী প্রদর্শন ক’রে অনুদান প্রদান করে না? কেন কেবল মাত্র ‘তেলো মাথায় ঢালে তেল আর রুখু মাথায় ভাঙ্গে বেল?’ কেন এ এহসানীর অনুদান কেবলমাত্র তাদেরকেই দেয় যারা তাকে টাকা ঋণ দেয়? পক্ষান্তরে বিদিত যে, এই অনুদানের টাকা আসে সরাসরি শর্তারোপিত সূদভিত্তিক ঋণের কারণেই। আবার যে অনুদান ব্যাংক দেয় তাও কত শোষণ, কত সূদ এবং কত হারাম ব্যবসার লভ্যাংশ (?) থেকেই দেয়, কোন পবিত্র বাপুত্তি মাল থেকে নয়। সুতরাং সে অনুদান যে অনুদান নয়; বরং ‘গরু মেরে জুতো দান’ তা বলাই বাহুল্য।

মুসলমানদের উন্নতির বহু পথ খোলা। নাই বা অবলম্বন করল ঐ অলস অকর্মণ্যদের অসৎ পথ। অবৈধ ও অসৎ অর্থ-ব্যবস্থা প্রণয়ন করে যারা উন্নত নাইবা তাকালো তারা তাদের দিকে?

আল্লাহ যে বলেন,

﴿وَلا تَمُدَّنَ عَيْنَيْكَ إِلَى مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجاً مِنْهُمْ زَهْرَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا لِنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَرِزْقُ رَبِّكَ خَيْرٌ وَأَبْقَى﴾

‘‘আমি অবিশ্বাসীদের কতককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগবিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি তার প্রতি তুমি কখনো দৃক্পাত করো না। তোমার প্রতিপালক প্রদত্ত জীবনোপকরণ হল উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী।’’[2]

তাদের নবী (সাঃ) যে বলেন,

الرِّبَا وَإِنْ كَثُرَ فَإِنَّ عَاقِبَتَهُ تَصِيرُ إِلَى قُلٍّ.

‘‘সূদের (উন্নতির) পরিমাণ যত বেশীই হোকনা কেন পরিণামে তা কম হতে বাধ্য।’’ (আহমদ১/৩৯৫, ইবনে মাজাহ ২২৭৯ নং)

তাছাড়া মুসলিমদের প্রধান লক্ষ্য আখেরাত। সুতরাং যে পার্থিব উন্নয়নে আখেরাত বরবাদ হয় তা কি প্রকৃত উন্নতি না অবনতি?

ইসলাম মানুষের সার্বিক কল্যাণের জন্য আল্লাহর এক অনুগ্রহ। তাতে রয়েছে পুঁজিবাদ ও কম্যুনিজামের মধ্যবর্তী এক ভারসাম্যপূর্ণ শাশ্বত অর্থব্যবস্থা। এরই অনুসরণে আছে মানুষের চির মঙ্গল।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلالاً طَيِّباً وَلا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ (168) إِنَّمَا يَأْمُرُكُمْ بِالسُّوءِ وَالْفَحْشَاءِ وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللهِ مَا لا تَعْلَمُونَ﴾

‘‘হে মানবমন্ডলী! পৃথিবীর বুকে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্ত্ত রয়েছে তা হতে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কারণ, সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। সে তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয় এবং সে চায় যে, তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে যা জানো না তা বল।’’[3]

প্রিয় নবী (সাঃ) বলেন, আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্ত্তই গ্রহণ করেন। তিনি মুমিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন যে আদেশ করেছেন আমিবয়াগণকে; তিনি বলেছেন,

﴿يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحاً إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ﴾

‘‘হে রসূলগণ! তোমরা হালাল খাদ্য ভক্ষণ কর এবং সৎকর্ম কর।’’[4]

আর বলেছেন,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ﴾

‘‘হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুজী দান করেছি, তা থেকে হালাল বস্ত্ত আহার কর।’’[5]

অতঃপর নবী (সাঃ) এমন লোকের কথা উল্লেখ করে বলেন, যে (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) লম্বা সফর করে তার অবস্থা আলুথালু এবং ধূলিমলিন। সে আকাশ দিকে তার হাত দুটিকে তুলে দুআ করে, ‘হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!–’ অথচ তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম তার পরিধেয় বস্ত্র হারাম, তার দেহের রক্ত-গোশত হারাম। সুতরাং তার দুআ আর কিরূপে কখন কবুল হতে পারে?[6]

ব্যাংকের সূদকে যদি সূদ মনে করেন ও বলে থাকেন, তবে আপনার নিকট তো সন্দেহই থাকে না। কিন্তু সন্দেহের মেঘমালা যদি আপনার মনের আকাশে ভিঁড় করে তাহলেই সমস্যা। সূদ না বলে যদি আপনি নিজের তরফ থেকে ‘লভ্যাংশ, অনুদান উপহার, এহসানী’ প্রভৃতি বলেন, অথচ ব্যাংকাররা তথা সারা দুনিয়ার লোকেরা তাকে সূদ বলে ও চেনে তাহলেই ইজতিহাদবাজীর দরজা খোলা যায় এ ব্যাপারে। তবে একথা সত্য যে, হালাল ভাবলেও আপনার মনের মাঝে অবশ্যই একটা ‘কিন্তু’ বা জিজ্ঞাসাচিহ্ন থেকেই যায়। কারণ অধিক সংখ্যক এবং সমস্ত গণ্যমান্য ওলামাগণ সর্বসম্মতভাবে তাকে হারাম বলেন। সুতরাং সন্দেহের মেঘে আপনার চলার পথ অন্ধকার নিশ্চয়ই। অতএব পথ উজ্জ্বল করতে নবী (সাঃ) এর নির্দেশ শুনুনঃ-

إِنَّ الْحَلَالَ بَيِّنٌ وَالْحَرَامَ بَيِّنٌ وَبَيْنَهُمَا مُشْتَبِهَاتٌ لَا يَعْلَمُهَا كَثِيرٌ مِنْ النَّاسِ فَمَنْ اتَّقَى الشُّبُهَاتِ اسْتَبْرَأَ فِيهِ لِدِينِهِ وَعِرْضِهِ وَمَنْ وَاقَعَهَا وَاقَعَ الْحَرَامَ.

‘‘(কুরআন হাদীসে) হালাল কি তা স্পষ্ট এবং হারাম যা তাও স্পষ্ট। কিন্তু এ উভয়ের মাঝে রয়েছে বহু সন্দিগ্ধ বিষয়াদি। যা বহু লোকেই চেনে না। অতএব যে ব্যক্তি ঐ সকল সন্দিগ্ধ বিষয়াদি থেকে বাঁচতে পারে, সে তার দ্বীন ও সম্ভ্রমকেও বাঁচিয়ে নেয়। আর যে ব্যক্তি সন্দিগ্ধ বিষয়াবলীতে আপতিত হয় সে হারামে আপতিত হয়—।’’[7]

دَعْ مَا يَرِيبُكَ إِلَى مَا لاَ يَرِيبُكَ.

‘‘সে জিনিস বর্জন কর যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে এবং তা অবলম্বন কর যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না।’’[8]

ব্যাংক সম্বন্ধে আপনার মনে যে বিভ্রান্তি ও সন্দেহের কালো মেঘ ঘনীভূত আছে—আশা করি তা এই পুস্তিকার ঝড়ে উড়ে গিয়ে আপনার হৃদয়গগন স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। আর এই আশাতেই অনুবাদের এই পদক্ষেপ। আশা পূর্ণ হলে শ্রম সার্থক হবে।

মূল বইটি উর্দূ ভাষায় লিখিত। লেখক বানারসের সালাফিয়্যাহ ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকতা করার পর মদীনা নববিয়্যায় কর্মরত। তিনি আরো কয়েকখানি পুস্তক-প্রণেতা। সরাসরি তাঁরই কথামতে এই পুস্তিকা বাংলায় রূপদান করে বাংলাভাষী ভাইদেরকে উপহার দিতে পেরে আমি আনন্দবোধ করছি। আল্লাহ আমাদের এই নগণ্য খিদমতকে কবুল করে মুসলিম সমাজকে সুপথ প্রদর্শন করুন। আমীন।


দ্বীনের খাদেম

আব্দুল হামীদ আলমাজমাআহ ১২/১২/৯৭[1] (বুখারী ,মিশকাত ২৭৮৬নং)

[2] (সূরা ত্বা-হা ১৩১ আয়াত)

[3] (সূরা বাকারাহ ১৬৮-১৬৯ আয়াত)

[4] (সূরা মুমিনূন ৫১ আয়াত)

[5] (সূরা বাক্বারাহ ১৭২ আয়াত)

[6] (মুসলিম, মিশকাত ২৭৬০নং)

[7] (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ২৭৬২নং)

[8] (আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ, দারেমী, মিশকাত ২৭৭৩নং)