শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

নিফাস-(মাসিক)

নিফাস-(মাসিক)
নারীর জরায়ু থেকে সন্তান প্রসবের কারণে যে রক্ত বের হয়।

নিফাসের সময়সীমা
নিফাসের সর্বনিম্ন সুনির্দিষ্ট সময় বলতে কিছু নেই। তবে সর্বোচ্চ সময় হলো চল্লিশদিন। তবে যদি নারী এর পূর্বে পবিত্রতা দেখে তবে গোসল করবে ও নামাজ আদায় করবে।

নিফাসের আহকাম
১- প্রসবের পর যদি রক্ত দেখা না যায় – এরূপ অবশ্য খুব কমই ঘটে থাকে -তাহলে অজু করে নামাজ পড়ে নিতে হবে। এ অবস্থায় গোসল করতে হবে না।

২- যদি রক্তস্রাব চল্লিশদিন অতিক্রম করে যায় আর নারীর চল্লিশদিন পর নিফাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভ্যাস থাকে, অথবা অতি দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আলামত প্রকাশ পায়, তাহলে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যদি বন্ধ না হয় তাহলে তা ইস্তিহাযা বলে গণ্য হবে। এবং এ ক্ষেত্রে ইস্তিহাযার সকল হুকুম বর্তাবে।

৩- আর যদি চল্লিশদিনের পূর্বেই পবিত্র হয়ে যায়, কিন্তু চল্লিশদিন শেষ হওয়ার আগে আবার ফিরে আসে, তাহলে এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে :
ক – যদি জানা যায় যে তা নিফাসের রক্ত, তাহলে তা নিফাস বলেই গণ্য হবে।
খ – আর যদি জানা যায় তা নিফাসের রক্ত না তবে নারীর এ অবস্থাকে পবিত্রাবস্থা বলে ধরা হবে।

৪- দৃশ্যমান অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গসম্পন্ন মানব সন্তান প্রসবের পর যে রক্তস্রাব বের হয় তাকে নিফাস বলে। আর যদি এমন সন্তান প্রসব হয় যার অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ দৃশ্যমান নয়, তাহলে এর কয়েকটি অবস্থা হতে পারে:
ক – হয়তো গর্ভ শুরু হওয়ার প্রথম চল্লিশদিনের পূর্বেই গর্ভপাত হবে।যদি এরূপ হয় তবে তা পচা রক্ত বলে ধরা হবে। এমতাবস্থায় নারী নামাজ পড়বে ও রোজা রাখবে।
খ – অথবা আশিদিন পর গর্ভপাত ঘটবে। তাহলে এটাকে নিফাসের রক্ত বলে ধরা হবে।
গ- আর যদি চল্লিশদিন থেকে আশিদিনের মধ্যে গর্ভপাত ঘটে তবে দেখতে হবে, অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গের আলামত প্রকাশ পেয়েছে কি না, যদি আলামত প্রকাশ পেয়ে থাকে তবে তা নিফাসের রক্ত বলে ধরা হবে। অন্যথায় তা পচা রক্ত বলে ধরা হবে।

হায়েয ও নিফাসের কারণে যা কিছু হারাম হয়ে যায়
১ – স্বামী-স্ত্রীর মিলন
আল্লাহ তাআলা বলেন,
(وَيَسۡ‍َٔلُونَكَ عَنِ ٱلۡمَحِيضِۖ قُلۡ هُوَ أَذٗى فَٱعۡتَزِلُواْ ٱلنِّسَآءَ فِي ٱلۡمَحِيضِ وَلَا تَقۡرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطۡهُرۡنَۖ فَإِذَا تَطَهَّرۡنَ فَأۡتُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ أَمَرَكُمُ ٱللَّهُۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلۡمُتَطَهِّرِينَ ٢٢٢ )
{আর তারা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বল, তা কষ্ট। সুতরাং তোমরা ঋতুস্রাবকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্ল­াহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে।} [সূরা আল বাকারাহ: ২২২]
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত আয়াত নাযিল হলে বলেছেন, ‘তোমরা সবকিছু করো, কেবল স্বামী-স্ত্রীর মিলন ব্যতীত।’(বর্ণনায় মুসলিম)

মাসায়েল
১- হায়েয অবস্থায় যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হলো সে গুনাহগার। এ ব্যক্তির ওপর কাফফরা দেয়া ওয়াজিব। স্ত্রীর ওপরও কাফফারা ওয়াজিব হবে যদি মিলনের সময় স্ত্রী সম্মত থাকে।

আর এই ক্ষেত্রে কাফফারা হলো, এক দিনার অথবা অর্ধ দিনার পরিমাণ স্বর্ণ দান করা। ইবনে আব্বাস রাযি. এর বর্ণনা অনুযায়ী যে ব্যক্তি হায়েয অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলিত হলো তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এক দিনার বা অর্ধ দিনার পরিমাণ সদকা করবে।’(বর্ণনায় মুসলিম)

একদিনার হলো ৪.২৫ গ্রাম স্বর্ণ ।

২- যদি হায়েয থেকে স্ত্রী পবিত্র হয় তবে তার সাথে মিলিত হবে না যতক্ষণ না সে গোসল করে নেয়। ইরশাদ হয়েছে:
( وَلَا تَقۡرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطۡهُرۡنَۖ )
{‘তোমরা ঋতুস্রাবকালে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাক এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না।’}
[সূরা আল বাকারা:২২২] এখানে ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়াকে বুঝানো হয়েছে। এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন,
(فَإِذَا تَطَهَّرۡنَ فَأۡتُوهُنَّ مِنۡ حَيۡثُ أَمَرَكُمُ ٱللَّهُۚ )
{অতঃপর যখন তারা (গোসল করে) পবিত্র হবে তখন তাদের নিকট আস, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।}

২- নামাজ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,‘তোমার যখন হায়েয আসবে তখন নামাজ ছেড়ে দাও, আর যখন হায়েয চলে যাবে তখন রক্ত ধৌত করতে গোসল করো এবং নামাজ আদায় করো।’(বর্ণনায় আবু দাউদ)

মাসায়েল
১- নারী যখন পবিত্র হবে তখন হায়েয অবস্থায় যেসব নামাজ চলে গিয়েছে তা আদায় করতে হবে না। এর প্রমাণ আয়েশা রাযি. কে, হায়েযগ্রস্ত নারী নামাজ রোজা আদায় করবে কি না, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,‘এ বিষয়টি আমাদের স্পর্শ করত। অতঃপর আমাদেরকে রোজা কাজা করার নির্দেশ দেয়া হত, তবে নামাজ কাজা করার নির্দেশ দেয়া হত না।’
(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

২- পবিত্র হওয়ার পর যদি পূর্ণাঙ্গ এক রাকাত নামাজ পড়া যাবে এমন সময় থাকে তবে তার ওপর ওই ওয়াক্তের নামাজ ফরজ হবে। হোক তা নামাজের সময় আসার প্রথম অংশে অথবা শেষাংশে। যদি পূর্ণাঙ্গ এক রাকাত নামাজ পড়ার মতো সময় না থাকে, তবে নামাজ পড়া ফরজ হবে না। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এক রাকাত নামাজ পেল সে পুরো নামাজই পেল।’
(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

৩- রোজা
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যখন নারীর হায়েয আসে তখন সে কি নামাজ রোজা ছেড়ে দেয় না? উত্তরে তারা বলল,‘ জী’।(বর্ণনায় বুখারী)

মাসআলা
হায়েযগ্রস্ত নারী যদি সুবহে সাদেকের পূর্বে পবিত্রতা অর্জন করে অতঃপর রোজা রাখে, তবে তার রোজা জায়েয হবে, এমনকি যদি সুবহে সাদেকের পর গোসল করে তবুও।

৪- কুরআন স্পর্শ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন, (لَّا يَمَسُّهُۥٓ إِلَّا ٱلۡمُطَهَّرُونَ ٧٩ ) {কেউ তা স্পর্শ করবেনা পবিত্রগন ছাড়া,}[সূরা আল ওয়াকিয়া:৭৯]

৫- পবিত্র কাবার তাওয়াফ করা
এর যখন ঋতুস্রাব এল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন,‘হাজ্বী যা করে তা করে যাও, তবে তুমি পবিত্র হওয়ার পূর্বে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করো না’।
হাদীসটি ইমাম মালিক তার মুয়াত্তায় উল্লেখ করেছেন) ইবনে আব্বাস রাযি. বলেছেন,‘লোকদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে তাদের সর্বশেষ কর্ম যেন হয় বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করা। তবে তিনি হায়েযগ্রস্ত নারীর জন্য এ ব্যাপারে ছাড় দিয়েছেন।(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

৬- মসজিদে অবস্থান করা তবে যদি তা কেবল অতিক্রম করার জন্য হয়
আল্লাহ তাআলা বলেন,

(يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَقۡرَبُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَأَنتُمۡ سُكَٰرَىٰ حَتَّىٰ تَعۡلَمُواْ مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّىٰ تَغۡتَسِلُواْۚ )
{হে মুমিনগণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পার যা তোমরা বল এবং অপবিত্র অবস্থায়ও না, যতক্ষণ না তোমরা গোসল কর তবে যদি তোমরা পথ অতিক্রমকারী হও।} [আন নিসা:৪৩] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমি হায়েযগ্রস্ত নারী ও জুনুবির জন্য মসজিদ অবৈধ করিছি।’
(বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)

মাসায়েল
১- হায়েযগ্রস্ত নারী যদি ন্যাপকিন বেঁধে রাখে এবং মসজিদ অপবিত্র হওয়ার ভয় না থাকে তবে মসজিদের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করায় কোনো সমস্যা হবে না। এর প্রমাণ আল্লাহ তাআলার বাণী, {তবে যদি তোমরা পথ অতিক্রমকারী হও}[আন নিসা:৪৩]

২- হায়েযগ্রস্ত নারী ঈদের নামাজ পড়ার স্থল থেকে দূরে অবস্থান করবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘হায়েযগ্রস্ত নারীরা ঈদের নামাজ পড়ার স্থল বর্জন করবে।’(বর্ণনায় আবু দাউদ)

৭- তালাক
স্ত্রী হায়েযগ্রস্ত হলে স্বামী কর্তৃক তাকে তালাক দেয়া হারাম হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

(يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ إِذَا طَلَّقۡتُمُ ٱلنِّسَآءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ )
{হে নবী, (বল), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও।}
অর্থাৎ এমন সময় তালাক দেবে যাতে ইদ্দত পালন করার সুনির্দিষ্ট সময় সে সামনে পায়। তবে হায়েযগ্রস্ত নারীকে তালাক প্রদান হারাম ও বিদআত হলেও তা কার্যকর হবে

Leave a Reply

Close Menu