শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

হায়েয, ইস্তেহাযা ও নিফাস (মাসিক)

হায়েয, ইস্তেহাযা ও নিফাস (মাসিক)

আভিধানিক অর্থে হায়েয
কোনো কিছু প্রবাহিত হওয়া

শরীয়তের পরিভাষায় হায়েয
নারীর সুস্থ জরায়ু থেকে সুনির্দিষ্ট সময়ে, কোনো কারণ ব্যতীতই যে রক্তস্রাব বের হয় তাকে হায়েয বলে।

হায়েযের রক্তস্রাবের ধরণ
কালো, যেন তা পুড়ে-যাওয়া কৃষ্ণ কোনো পদার্থ, কষ্টদায়ক, দুর্গন্ধযুক্ত, এবং এ সময় নারী প্রচন্ড তাপ অনুভব করে।

হায়েয শুরু হওয়ার বয়স
হায়েয শুরু হওয়ার সুনির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। নারীর প্রকৃতি ও পরিবেশ অনুযায়ী তা ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই নারী যখন হায়েযের স্রাব দেখে তখন সেটাকেই হায়েয ধরা হবে।

হায়েযের সময়সীমা
হায়েযের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। নারীদের কারও তিনদিন, আবার কারও চারদিন হায়েয হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হায়েয ছয় অথবা সাতদিন হয়ে থাকে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামনা বিনতে জাহাশকে বলেছেন, যার অনেক দিন হায়েয হতো, ‘তুমি আল্লাহর ইলম অনুযায়ী ছয়দিন অথবা সাতদিন হায়েয গণনা করো, অতঃপর গোসল করো।’(বর্ণনায় আবু দাউদ)

মাসায়েল
১. মূলত গর্ভবতী নারীর হায়েয হয় না। তাই যদি কোনো নারী প্রসবের অল্প কিছু সময় পূর্বে রক্ত দেখে এবং জরায়ুতে প্রসবের ব্যাথা অনুভব হয়, তবে তা নিফাসের রক্ত। আর যদি প্রসবের ব্যাথা অনুভূত না হয় এবং তা বেশ কিছু দিন পূর্বে হয়, তবে তা হায়েযের রক্ত বলে গণ্য হবে।

২. কোনো নারীর নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে যদি হায়েয আসে, যেমন মাসের শুরুতে হায়েয আসার কথা কিন্তু তার পরিবর্তে হায়েয এলো মাসের শেষে। অথবা সুনির্দিষ্ট সময়ের কম অথবা বেশি হলো, যেমন সাধারণত ছয়দিন হায়েয হয়, তবে এবার হলো সাতদিন। এরূপ হলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হবে না। বরং যখন হায়েযের রক্ত দেখা যাবে সেটাকেই হায়েয মনে করা হবে। আর যখন পবিত্রতা দেখা যাবে তখন সেটাকে পবিত্রতা মনে করতে হবে।

৩. নারীর পবিত্র হওয়া বুঝা যাবে সাদা স্রাব নির্গত হওয়ার মাধ্যমে। যদি সাদা স্রাব নির্গত না হয়, তাহলে শুষ্কতা পবিত্রতার আলামত বলে ধরা হবে। যেমন, যদি সাদা তুলা নারীর গুপ্তাঙ্গে রাখা হয় আর তা শুষ্কাবস্থায় বের হয়ে আসে, তবে তা পবিত্রতার আলামত বলে ধরা হবে।

হায়েযের আহকাম
সুফরা
হলুদ রঙ্গের স্রাব।
কুদরা
হলুদ ও কালো রঙ্গের মাঝামাঝি রঙ্গের স্রাব।

যদি কোনো নারী হলুদ রঙ্গের স্রাব দেখে, অথবা হলুদ ও কালোর মাঝামাঝি রঙ্গের রক্ত দেখে অথবা শুধু আদ্রতা দেখে তবে তার দু’অবস্থা হতে পারে:

১ – নারী হয়তো তা হায়েযের সময়সীমার মধ্যে অথবা পবিত্রতা অর্জনের সামান্য পূর্বে দেখবে
এ অবস্থায় তা হায়েয বলে গণ্য হবে; এর প্রমাণ আয়েশা রাযি. এর হাদীস,‘নারীরা তাঁর কাছে ব্যবহৃত তুলা পাঠাত যাতে হুলুদ বর্ণের রক্ত থাকত, অতঃপর তিনি বলতেন, ‘তাড়াহুড়া করো না যতক্ষণ না সাদা স্রাব দেখ। এর দ্বারা তিনি হায়েয থেকে পবিত্রতাকে বুঝিয়েছেন।’(বর্ণনায় ইমাম মালিক)

২ – নারী হয়তো তা পবিত্র অবস্থায় দেখবে
এ অবস্থায় তা হিসাবে আনা হবে না। এরূপ স্রাব এলে অজু ও গোসল কোনোটাই ফরজ হবে না। উম্মে আতিয়া রাযি. বলেন, ‘আমরা পবিত্রতা অর্জনের পর কুদরা ও সুফরাকে হিসাবে আনতাম না।’(বর্ণনায় আবু দাউদ)

নারী যদি একদিন রক্ত দেখে, অন্যদিন না দেখে, তবে তার দু’অবস্থা হতে পারে:

১ – অবস্থা সবসময় থাকা
তাহলে তা ইস্তিহাযার স্রাব বলে ধরা হবে।

২ – অথবা কেটে কেটে আসা
অর্থাৎ কিছু সময় আসা আবার কিছু সময় বন্ধ থাকা। এরূপ হলে তার হুকুম হবে নিম্নরূপ:

ক – যদি পুরো একদিনের কম হায়েযের স্রাব না আসে তবে তা হায়েযের মধ্যেই হিসাব করা হবে।
খ – যদি পবিত্রতার সময় নারী এমন জিনিস দেখে যা পবিত্রতাকে নির্দেশ করে যেমন সাদা স্রাব দেখল, তাহলে এ সময়টা পবিত্রতার মধ্যে ধরা হবে। চাই তা কম হোক বা বেশি হোক। অথবা তা একদিনের কম বা বেশি হোক।

ইস্তিহাযা

স্ত্রী অঙ্গ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ত প্রবাহিত হওয়া, অথবা কিছু সময়ের জন্য থেমে আবার প্রবাহিত হওয়া।

হায়েযের রক্ত
ইস্তিহাযার রক্ত, গাড় কালো, হালকা লাল, এর রয়েছে পচা দুর্গন্ধ, এর কোনো গন্ধ নেই, জমাট বাঁধে না, জমাট বেঁধে যায়, জরায়ুর সর্বশেষ প্রান্ত থেকে বের হয়, জরায়ুর মুখে অবস্থিত একটি রগ থেকে বের হয়, স্বাভাবিক ও সুস্থাবস্থার রক্ত, কোনো সমস্যা ও অসুস্থতাজনিত রক্ত, যা সুনির্দিষ্ট সময় নির্গত হয়, যা সুযার কোনো সুনির্দিষ্ট সময় নেই

প্রথম অবস্থা: ইস্তিহাযার পূর্বে নারীর সুনির্দিষ্ট সময়ে ঋতুস্রাবের অভ্যাস থাকা
এই প্রকৃতির নারী তার ঋতুস্রাবের সুনির্দিষ্ট সময়কে হায়েয হিসেবে বিবেচনা করবে, এবং মাসের বাকি দিনগুলোকে ইস্তিহাযা হিসেবে ধরবে। আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, ফাতেমা বিনতে আবি হুবাইশ রাযি. বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, ‘আমি পবিত্র হই না। অতঃপর আমি কি নামাজ পরিত্যাগ করব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘না, ওটা হলো শরীরের রক্ত নালী হতে নিসৃত রক্ত সাদৃশ। তবে তোমার যে কয়দিন ঋতুস্রাব হওয়ার অভ্যাস ছিল সে কয়দিন নামাজ ছেড়ে দাও। এরপর গোসল করো ও নামাজ পড়ো।’(বর্ণনায় বুখারী)

এই প্রকৃতির নারী তার ঋতুস্রাবের সুনির্দিষ্ট সময়কে হায়েয হিসেবে বিবেচনা করবে, এবং মাসের বাকি দিনগুলোকে ইস্তিহাযা হিসেবে ধরবে। আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, ফাতেমা বিনতে আবি হুবাইশ রাযি. বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, ‘আমি পবিত্র হই না। অতঃপর আমি কি নামাজ পরিত্যাগ করব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘না, ওটা হলো শরীরের রক্ত নালী হতে নিসৃত রক্ত সাদৃশ। তবে তোমার যে কয়দিন ঋতুস্রাব হওয়ার অভ্যাস ছিল সে কয়দিন নামাজ ছেড়ে দাও। এরপর গোসল করো ও নামাজ পড়ো।’(বর্ণনায় বুখারী)

দ্বিতীয় অবস্থা : ঋতুস্রাবের জানা কোনো অভ্যাস না থাকা। তবে হায়েয ও ইস্তিহাযার রক্তের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম হওয়া।
এই প্রকৃতির নারী তার পার্থক্য করার ভিত্তিতে আমল করবে। ফাতেমা বিনতে আবি হুবাইশ রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি ইস্তিহাযাগ্রস্তা হতেন। অতঃপর রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, ‘যদি হায়েযের রক্ত হয় তবে তা পরিচিত কালো রক্ত হবে। যদি এরূপ হয় তবে নামাজ পড়া থেকে বিরত হও। আর যদি এর অন্যথা হয়, তবে অজু করো ও নামাজ পড়ো; কেননা তা শরীরের রক্ত নালী হতে নিসৃত রক্ত সাদৃশ।’
(বর্ণনায় আবু দাউদ)

তৃতীয় অবস্থা: সুনির্দিষ্ট কোনো অভ্যাস না থাকা এবং পার্থক্য করতেও অক্ষম হওয়া।
এ প্রকৃতির নারী অধিকাংশ নারীদের অভ্যাস মুতাবেক আমল করবে। অতঃপর প্রতিমাসে ছয় অথবা সাতদিন হায়েয হিসাব করবে। স্রাব শুরু হওয়ার প্রথমদিন থেকে হিসাব করবে। আর মাসের অবশিষ্ট দিনগুলো ইস্তিহাযা হিসেবে ধরবে। এর প্রমাণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামনা বিনতে জাহাশ রাযি. কে বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর ইলম অনুযায়ী ছয় অথবা সাতদিন হায়েয হিসাব করো, অতঃপর গোসল করো। এরপর যখন দেখবে যে তুমি পবিত্র হয়েছ, তখন তেইশ অথবা চব্বিশদিন নামাজ পড়ো ও রোজা রাখো। এটাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে। প্রতি মাসেই তুমি অনুরূপ করো, অন্যান্য নারীদের মতো অর্থাৎ তাদের হায়েয ও পবিত্রতার সময়ের মতো।’(বর্ণনায় আবু দাউদ)

চতুর্থ অবস্থা : নারীর সুনির্দিষ্ট সময়ে ঋতুস্রাব আসার অভ্যাস থাকা এবং একই সাথে পার্থক্য করতে সক্ষম হওয়া।
এ অবস্থায় অভ্যাসটাকে হিসেবে আনা হবে, পার্থক্য করাটাকে নয়; কেননা অভ্যাসটাই নারীর জন্যে অধিক নিয়মানুবর্তী। তবে যদি নারী ভুলে যায় তার অভ্যাস কি ছিল, এমতাবস্থায় পার্থক্যকরণের ভিত্তির ওপর আমল করা হবে।

মাসায়েল

১. যদি হায়েয সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে নারীর জানা থাকে, তবে কয়দিন হায়েয হয় তা ভুলে যায়, এমতাবস্থায় অধিকাংশ নারীদের অভ্যাস অনুযায়ী সময় হিসাব করতে হবে।

২. কয়দিন হায়েয হয় যদি তা জানা থাকে, তবে তা কখন হয়, মাসের শুরুতে না শেষে তা মনে না থাকে, তাহলে হায়েযের দিনগুলো মাসের শুরুতে হিসাব করবে। যদি মাসের মধ্যখানে হায়েয আসত বলে মনে করতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কবে শুরু হত তা বলতে না পারে, তাহলে মাসের মধ্যখানের প্রথমাংশে হায়েযের সময় হিসাব করবে। কেননা মাসের মাঝখান থেকে হিসাব করা, সময় নিয়ন্ত্রণের জন্য, নারীর পক্ষে সহজ।

যদি হায়েযের সময় চলে যায়, আর নারী ইস্তিহাযাগ্রস্ত থাকে তবে নামাজ রোজা পালন করে যাবে। অজুর পর যদি রক্ত আসে তবে তাতে কোনো ক্ষতি হবে না; কেননা এটাকে ওজর হিসাবে ধরা হবে। এ ক্ষেত্রে নারীর পবিত্রতা অর্জন তিনভাবে হতে পারে:
ক – নামাজের সময় আসার পর প্রতি নামাজের জন্য অজু করবে। এর প্রমাণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতেমা বিনতে আবি হুবাইশকে বলেছেন,‘অতঃপর তুমি প্রত্যেক নামাজের জন্য অজু করো ও নামাজ আদায় করে নাও।
(বর্ণনায় আবু দাউদ)

খ – যোহরের নামাজ একেবারে শেষ ওয়াক্তে পিছিয়ে দেবে। অতঃপর গোসল করে যোহর ও আসর একসাথে আদায় করে নেবে। মাগরিব ও এশা একইরূপে আদায় করবে। এর দলিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হামনা বিনতে জাহাশ রাযি. কে বলেছেন, ‘তুমি যদি পার যোহরের নামাজ পিছিয়ে দিতে ও আসরের নামাজ সময় শুরু হওয়ার সাথে সাথে পড়তে তবে গোসল করে উভয় নামাজ একসাথে জমা করে পড়ে নেবে। অর্থাৎ যোহর ও আসর। আর যদি পার মাগরিব পিছিয়ে দিতে ও এশা প্রথম ওয়াক্তে পড়তে তাহলে গোসল করে দুই নামাজ একত্রে পড়তে পারলে পড়ে নেবে। ফজরের সময় গোসল করে ফজর পড়ে নেবে। আর যদি রোজা রাখতে সক্ষম হও তবে রোজা রাখবে।’(বর্ণনায় আবু দাউদ)

গ- প্রত্যেক নামাজের জন্য আলাদাভাবে গোসল করবে; এক বর্ণনায় এসেছে, উম্মে হাবিবা রাযি. সাত বছর পর্যন্ত ইস্তিহাযাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে গোসল করতে নির্দেশ দেন। অতঃপর তিনি প্রতি নামাজের জন্য গোসল করতেন।(বর্ণনায় বুখারী)

৩. যদি কোনো কারণে নারীর রক্তক্ষরণ ঘটে, যেমন জরায়ুতে অস্ত্রপাচার করা হলো, যার ফলে রক্তপাত হলো, এর দু’অবস্থা হতে পারে:
ক – হায়েয আসবে না বলে নিশ্চিত জ্ঞান থাকা। এমতাবস্থায় এটাকে ইস্তিহাযা বলে ধরা হবে না। এ কারণে কোনো ওয়াক্ত নামাজ থেকে বিরত হওয়া যাবে না। এ সময় নির্গত রক্ত অসুস্থতাজনিত কারণে নির্গত রক্ত বলে ধরা হবে। এ অবস্থায় প্রতি ওয়াক্ত নামাজের জন্য অজু করতে হবে।

৪. হায়েয হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানা থাকা। এ অবস্থায় নির্গত রক্তের হুকুম হবে ইস্তিহাযার মতো।
৫. ইস্তিহাযাগ্রস্ত স্ত্রীর সাথে দৈহিক মিলন বৈধ; কেননা শরীয়তে এ ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি।

Leave a Reply

Close Menu