শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

জানমাল রক্ষার ৭ আমল

লিখেছেনঃ মুফতি আহমদ মফিজ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুনাইয় অতি দয়ালু

আদম (আ.) কে সিজদা না করার কারণে যখন থেকে শয়তান লাঞ্ছিত-বঞ্চিত হয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে বিতাড়িত হয়েছে, তখন থেকেই সে বনি আদমের ক্ষতি করার পেছনে লেগে রয়েছে। তবে শুধু শয়তানই নয়, বরং সে তার দোসর দুষ্ট প্রকৃতির জিন ও ইনসানের মাধ্যমে জাদুটোনা করা, বানমারা, কুদৃষ্টি দেয়া ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের জানমালের বিভিন্নভাবে ক্ষতি করার চেষ্টায় লেগে রয়েছে। দুষ্ট প্রকৃতির জিন ও ইনসান দ্বারা মানুষের যেসব ক্ষতি সাধিত হয়ে থাকে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজ জীবনে পরস্পরের প্রতি হিংসাবিদ্বেষ ও রেষারেষি সৃষ্টি হওয়া, সর্বদা মন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকা, শিশুদের ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে জেগে ওঠা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আয়-উপার্জনে উন্নতি না হওয়া ইত্যাদি। তবে কোরআন ও হাদিসে আমাদের দুষ্ট প্রকৃতির জিন ও ইনসানের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন দোয়া-দরুদ শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কেউ যদি সেসব দোয়া-দরুদ নিয়মিত পাঠ করে তাহলে জিন ও ইনসানের মধ্যে শয়তানের যেসব দোসর রয়েছে, তারা কখনও কোনো মোমিনের ক্ষতি  করতে পরবে না। অতএব যারা চান যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের জিন ও শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন, তাদের উচিত কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া-দরুদগুলোর ওপর আমল করা। নিচে কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত কিছু দোয়া-দরুদ দেয়া হলো।  

১. আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। কেননা, যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা করবে, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে, তাকে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় মোমিনদের ওপর শয়তানের কোনো কর্তৃত্ব নেই, কেননা তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে।’ (সূরা নাহল : ৯৯)। অন্য আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।’ (সূরা তালাক : ৩)। 

২. প্রতিটি কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা। এ সম্পর্কে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ঘরে প্রবেশ করার সময় কিংবা খাদ্য গ্রহণের সময় বিসমিল্লাহ পাঠ করে, তখন শয়তান বলে এ বাড়িতে রাতযাপন ও রাতের খাবার গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার নাম না নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে তখন শয়তান (তার সঙ্গী-সাথীদের) বলে, তোমাদের রাতযাপনের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে যখন সে ব্যক্তি খাদ্য গ্রহণের সময়ও আল্লাহ তায়ালার নাম না নেয়, তখন শয়তান (তার সঙ্গী-সাথীদের) বলে, তোমাদের রাতযাপন ও রাতের খাদ্য গ্রহণ উভয়েরই ব্যবস্থা হয়ে গেছে।’ (মুসলিম : ৫৩৮১)।

অপর এক হাদিসে আলী ইবনে আবি তালেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, “তোমাদের কেউ যখন বাথরুমে প্রবেশ করে তখন তার লজ্জাস্থান ও শয়তান জিনের মাঝে পর্দা হচ্ছে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা।” (তিরমিজি : ৬০৬)। অতএব ‘বিসমিল্লাহ’ যে কতটা ফজিলত ও বরকতময়, এসব হাদিস তার প্রমাণ। তাই মোমিনের উচিত জীবনের প্রতিটি কাজে ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার চেষ্টা করা, যাতে আল্লাহ তায়ালা তাকে দুষ্ট জিন ও শয়তানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করেন।

৩. সূরায়ে ফালাক ও সূরায়ে নাস পাঠ করা। এ সম্পর্কে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কে যখন লবিদ ইবনে মুসিম জাদু করেছিল তখন আল্লাহ তায়ালা এ দুইটি সূরা নাজিল করেন, অতঃপর জিবরাঈল (আ.) এ দুইটি সূরা পাঠ করে নবী (আ.) এর প্রতি দম করেছিলেন, ফলে নবী (আ.) সুস্থ হয়েছিলেন। (আইসারুত তাফাসির, সূরা ফালাক দ্রষ্টব্য)। আল্লামা শফি (রহ.) মাআরেফুল কোরআনে লেখেন, এ দুইটি সূরার উপকারিতা যেহেতু সীমাহীন, তাই মানুষের জন্য এ দুইটি সূরার প্রয়োজনীয়তাও বর্ণনাতীত। কেননা জিন ও ইনসানের বদনজর এবং দৈহিক ও আত্মিক অনিষ্ট থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে এ দুইটি সূরার বিকল্প নেই। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআনের অনুবাদ : ১৪৮৪)।

৪. বেশি বেশি করে ‘লাহাওলা ওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পাঠ করা। এ সম্পর্কে আবু মুসা আশয়ারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, “আমি কি তোমাকে জান্নাতের ধনভা-ারের মধ্য থেকে একটি ধনভা-ারের সন্ধান দেব না? আবু মুসা আশয়ারি (রা.) বললেন, অবশ্যই দিন, তিনি বললেন, তুমি বলো, ‘লাহাওলা ওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।” (মুসলিম : ৭০৪৩)।
অপর এক হাদিসে রাসুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘লাহাওলা ওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ এর মধ্যে নিরানব্বইটি রোগের উপসম রয়েছে, তার মধ্যে সর্বনিম্ন হচ্ছে দুশ্চিন্তা দূর হওয়া। (মুসতাদরাকে হাকিম : ১৯৯০)।

৫. ‘বিসমিল্লা হিল্লাজি নায়ার্দুরু মায়াস মিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামায়ি ওহুয়াসসামিউল আলিম’ পাঠ করা। এ সম্পর্কে ওসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিদিন সকালে ও প্রতিদিন সন্ধ্যায় এ দোয়াটি তিনবার পাঠ করে তাহলে কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না।’ (তিরমিজি : ৩৩৮৫)।

৬. ‘আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত্তামাতি মিনশাররি মা খালাক’ পাঠ করা। এ সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! গত রাতে আমাকে একটি বিচ্ছু দংশন করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি তুমি সন্ধ্যায় এ কালেমাগুলো পাঠ করতে তাহলে বিচ্ছু তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারত না।’ (মুসলিম : ৭০৫৫)। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ, লা হাওলা ওলা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পাঠ করে তাকে বলা হয়, ‘তোমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, তোমাকে (বিপদাপদ থেকে) রক্ষা করা হবে, ফলে শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়।’ (তিরমিজি : ৩৪২২)।

৭. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যখন তুমি বিছানায় যাও তখন আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তাহলে সকাল পর্যন্ত একজন হেফাজতকারী (ফেরেশতা) তোমাকে হেফাজত করবে। সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে আসতে পারবে না।’ (বোখারি : ২৩১১)।


👋


আল্লাহ্‌ আপনাকে ও আমাকে উত্তম প্রতিদান দিন

Leave a Reply

Close Menu