শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল
বইঃ আদর্শ রমণী
অধ্যায়ঃ প্রস্তুতি পর্যায়?

অধায়


বিবাহ কেন করবে

অধ্যায়


ওজুহাত দূর কর

আদর্শ স্ত্রী, মা ও শাশুড়ী হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নাও। তোমাকে দান করা হবে এক বিশাল রাজত্ব, তুমি হবে তার রাণী। সেই রাজত্ব চালাবার আগাম উদ্যোগ
নাও।

মানসিক ভাবে প্রস্তুতি যাও যে, তুমি একজন আদর্শ স্ত্রী হবে এবং তোমাকে নিয়ে তোমার স্বামী গর্ববোধ করবে। এমন ‘মা’ হবে, যাকে নিয়ে ছেলে – মেয়েরা গর্ব করবে।

চারিত্রিক ভাবে প্রস্তুতি নাও যে, তুমি একজন পবিত্র মহিলা। তোমার চরিত্রে গুপ্ত অথবা প্রকাশ্য কোন কলঙ্ক থাকবে না। স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তোমার চরিত্রে মুগ্ধ হবে।

দৈহিক ভাবে প্রস্তুতি নাও যে, সর্বদা পরিষ্কার – পরিচ্ছন্ন থাকবে, পবিত্রতার নানা আহকাম শিখে নেবে এবং তোমার রূপচর্চায় স্বামীকে মুগ্ধ করবে।

একটা মানুষের সঙ্গে আনুগত্যের ব্যবহার করতে যে শ্রদ্ধা, আবেগ ও ভালবাসার প্রয়োজন হয়, তা সঞ্চয় করে রাখবে। শ্বশুর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে সৌজন্য ব্যবহার দেখিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিতা করার কৌশল অবশ্যই শিখে নেবে। আর তার জন্য জরুরী বই- পুস্তুক অবশ্যই পড়ে নেবে।

পড়ে নেবে তোমার নতুন জীবন –সাথীর সাথে নতুন খেলার কথা; যে খেলা কেবল তারই সাথে খেলা যায় এবং অন্যের সাথে মহাপাপ ও বিশ্বাস ঘাতকতা হয়।

সতর্কতার বিষয় যে, বাজারী রতিশাত্রের বই পড়ে মনের মাঝে নানা ভুল ধারণা সৃষ্টি করবে না। যেমন কোন বিরল নায়কের অতিরঞ্জিত প্রেম-কাহিনী পড়ে মনে মনে এই আশা পোষণ ক’রে রেখো না যে, তোমার নাগরও ঐরূপ হবে, যে তার জীবন – সঙ্গিনীর সমস্ত আশা – আবেদন রক্ষা করবে এবং কোন ভুলেই তাকে ‘কেন’ কথাটিও বলবে না।

কর্মগত ভাবে নিজেকে প্রস্তুত ক’রে নাও। মায়ের বাড়িতে আলালের ঘরে দুলালি হয়ে থাকলেও শ্বশুর বাড়িতেও সেই রকমই থাকবে তা জরুরী নয়। সেখানে রান্না-বান্না সহ আরো অনেক সংসারের কাজ করতে হবে। তা এওখন থেকেই নিজের বাড়িতে মায়ের কাছ হতে শিখে নাও। যাতে শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে তোমাকে এবং সেই সাথে তোমার মাকে কথা শুনতে না হয়। বাড়িতে পরাশোনা ইত্যাদি নানা ব্যস্ততার মাঝেও মাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা কর। তাতে তোমার ট্রেনিং হবে মায়ের কাজও হাল্কা হবে। মা হয়তো মায়া ক’রে তোমাকে কাজ করতে দেবে না; বলবে, ‘শ্বশুরবাড়ি গিয়ে করবি।’

আর তাতে যদি তুমি আদুরী হয়ে বসে থেকে সময় কাটাও, তাহলে অবশ্যই শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঠকতে হবে।

বিয়ের পরে পর্দা নয়, এখন থেকেই পর্দা কর। যাতে পরবর্তীতে অন্যের দেহে পর্দা দেখে তোমাকে গরম না লাগে এবং নিজে চাদর বা বোরকা পরলে গরমে জান বেরিয়ে না যায়। বাড়ির ভিতরে একটানা বাস করতে দম আটকে না যায়! বুঝতেই তো পারছ, পানির মাছকে পাড়ে, আর পাড়ের প্রাণীকে পানিতে আবদ্ধ করলে কি অবস্থা হয়?

তোমার তো সে অবস্থাও হতে পারে। এতএব সর্বোচ্চ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের বউ হতে পর্দার অভ্যাস কর।

বিয়ের পর স্বাধীনতা হারিয়ে যাবে, আর বেড়াতে পাবে না মনে ক’রে অনেক মা তার মেয়েকে যেখানে- সেখানে স্বাধীন ভাবে বেড়াতে পাঠিয়ে অনেক সময় শেষ বিপদে ফেলতে চায়। যদি তাই কর, তাহলে পর্দার কথা ভুলে যেয়ো না। স্বামীও তোমাকে বেড়াতে পারে। তাছাড়া বেড়াতে যাওয়া সাময়িক সুখ-বিলাসের কাজ। তা একবারে কয়েক দিন ক’রে নিলে এবং পরে না করতে পেলে লাভ কি? বিয়ের আগের সুখের রেশ কি বিয়ের পরেও অবশিষ্ট থাকবে?

জেনে রেখো বোনটি আমার! তুমি যেমন প্রস্তুতি নেবে, তেমনি বর পাবে। কানের মানে সোনা পাবে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর কানুন হল, “দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য; দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীর জন্য; সচ্চরিত্রা নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্রা নারীর জন্য (উপযুক্ত)।” (সূরা বূর-আয়াত ২৬)

অবশ্য এর বিপরীতও ঘটে থাকে। ‘অতি বর সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর।’ কিন্তু অধিকাংশই ‘য্যায়সন কা ত্যায়সন, শুঁটকি কা বায়গন’ই হয়ে থাকে।

এ ব্যাপারে সংক্ষেপে একটি রূপকথার অবাস্তব গল্প বলব তোমাকেঃ-

এক গ্রামে এক বুড়াবুড়ি বাস করত। তাদের কোন সন্তান ছিল না। শেষ জীবনে তাদের সন্তানের সখ চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল। তাই স্বামী-স্ত্রীতে একদিন ঘরের আঙ্গিনায় বসে আচল পেতে ভগবানের কাছে প্রার্থনা শুরু করে দিল।

‘হে ভগবান! কানা হোক, খোড়া হোক, খাদা হোক, বিকলাঙ্গ হোক, যেমন হবে হোক, আমাদের কে একটি সন্তান দান কর।’

এমন সময়ে উপর দিয়ে আকাশে একটি ঈগল একটি বর পাহাড়ী মাদি ইঁদুর ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার পা ফস্কে গেলে ইঁদুর টি বুড়ির আঁচলে এসে পড়ল।

বুড়ি তাই পেয়ে খুশি হল। ভগবানকে খুব ধন্যবাদ দিল। তাকে সযত্মে লালন-পালন করতে লাগল।

ইঁদুর টি বেশ নাদুস-নুদুস হয়ে বড় হল। তাদের সখ হল, তার বিয়ে দেবে।

জামাই খুঁজতে লাগল। সিদ্ধান্ত নিল, সবে ধন নীলমণি একমাত্র কন্যার বিয়ে যে-সে ঘরে দেবে না। তার বিয়ে সবচেয়ে বড় ঘরে দেবে। লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ক’রে জানতে পারল, এ বিশ্বের সবচেয়ে বর হল সূর্য । বুড়া সূর্যের কাছে আবেদন জানাল, ‘হে ভাই সূর্য! আমি শুনলাম, এ বিশ্বে তুমিই সবার বড়। আমি তোমার ঘরে আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে চাই।’

সূর্য হেসে বলল, ‘ভুল শুনেছ ঠাকুর! আমি বড় হলেও আমি একজনের কাছে হার মানতে বাধ্য হই। সুতরাং সেই হল আসল বড়।’

-কে সে?

-সে হল মেঘ। আমার বিশাল শক্তিকে সে পরাহত করে। আমার কিরণ সেই বিচ্ছুরিত করতে দেয় না। সুতরাং তুমি তার বাড়িতেই আত্মীয়তা কর।

‘তাই করব’ বলে সে মেঘকে সম্বোধন ক’রে বলল, ‘হে ভাই মেঘ! আমি শুনলাম, এ বিশ্বে তুমিই সবার বড়। আমি তোমার ঘরে আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে চাই। তুমি সূর্য থেকেও বড়!’

মেঘ হেসে বলল, ‘ভুল শুনেছ ঠাকুর! সূর্য থেকে বড় হলেও আমি একজনের কাছে হার মানতে বাধ্য হই। সুতরাং সেই হল আসল বড়।’

-কে সে?

-সে হল বাতাস। সে আমাকে উড়িয়ে যেখানে সেখানে নিয়ে যায়। তার কাছে আমার কোন শক্তি খাটে না। তুমি বরং তোমার পণ অনুযায়ী তার ঘরেই মেয়ের বিয়ে দাও।

‘তাই করব’ বলে বাতাসকে সম্বোধন ক’রে বলল, ‘হে ভাই বাতাস! আমি শুনলাম, এ বিশ্বে তুমিই সবার বড়। আমি তোমার ঘরে আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে চাই। সূর্য থেকে মেঘ, মেঘ থেকেও তুমি বড়! কি শক্তিশালী তুমি! তোমাকেই আমার বিয়াই করতে চাই।’

বাতাস হেসে বলল, ‘ভুল শুনেছ ঠাকুর! মেঘ থেকে হলেও আমি একজনের কাছে হার মানতে বাধ্য হই। সুতরাং সে আসল বড়।’

-কে সে?

-সে হল পাহাড়। আমি সব উড়িয়ে তছনছ করে দিই। কিন্তু তার কাছে আমার কোন শক্তি খাটে না। সেই হল বিশাল, বিরাট, মহাসম্রাট! তোমার পণ ঠিক রাখতে তারই ঘরে মেয়ের বিয়ে দাও।

‘তাই করব’ বলে সে পাহাড়ের নিকট গিয়ে বলল, ‘হে ভাই পাহাড়!

আমি শুনলাম, এ বিশ্বে তুমিই সবার বড়। আমি তোমার ঘরে আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে চাই। সূর্য থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বাতাস, বাতাস থেকেও তুমি বড়! কি শক্তিশালী তুমি! তোমাকেই আমার বিয়াই করতে চাই।’

পাহাড় হেসে বলল, ‘ভুল শুনেছ ঠাকুর!বাতাস থেকে শক্তিশালি হলেও, আমি একজনের কাছে অতি অসহায়। সুতরাং সেই হল আসল বড়।’

-কে সে?

-সে হল ইঁদুর। ঐ দেখ না, আমার পিঠকে সে কিভাবে ছিদ্র ছিদ্র করে ফেলেছে!

তোমার পণ ঠিক রাখতে তারই ঘরে মেয়ের বিয়ে দাও। সেখানেই পাবে তোমার উপযুক্ত জামাই।

‘তাই করব’ বলে সে পাহাড়ের গোড়ায় একটি গর্তের নিকট গিয়ে বল, ‘হে ভাই ইঁদুর! আমি শুনলাম, এ বিশ্বে তুমিই সবার চেয়ে বড়। আমি তোমার ঘরে আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিতে চাই। সূর্য থেকে মেঘ, মেঘ থেকে বাতাস, বাতাস থেকে পাহাড়, পাহাড় থেকেও তুমি বড়! কি শক্তিশালী ভাই তুমি! তোমাকেই আমার বিয়াই করতে চাই।’

একটি ইঁদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে হো-হো ক’রে হেসে বলল, তুমি ঠিক জায়গাতে এসেছ ঠাকুর! আমিই বিরাট, বিশাল, সবার চেয়ে বড়। আমি এ সম্বন্ধে রাজি আছি।

অতঃপর মহা ধুমধামের সাথে ইঁদুর কন্যার সাথে ইঁদুর বরের বিবাহ সম্পন্ন হল।

বুঝতেই পারছ, ক্ষুদ্রের সাথে বৃহতের সম্বন্ধ স্থির না হয়ে ঘুরতে ঘুরতে পরিশেষে সেই ক্ষুদ্রের সাথে ক্ষুদ্রের চমৎকার মিল হল।

সংস্কৃত ভাষায় একটি শ্লোক আছে, তাও উক্ত অর্থ সমর্থন করে, ‘জামাতা হডডিকশ্চৈব যোগ্যং যোগ্যেন যুজ্যতে।’

বলা বাহুল্য, তুমি নিজেকে মহতী ক’রে গড়ে তোল, তাহলেই মহান স্বামী লাভের সৌভাগ্য লাভ করবে ইন শাআল্লাহ।

বিবাহের পূর্বে কাউকে মন না দিয়ে আল্লাহর উপর ছেড়ে দাও। নিশ্চয় তোমার পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজন তোমার প্রতি অন্যায় করবে না।

যদি কারো দ্বীনদারীর কারণে তাকে ভালবেসেই ফেল, তাহলে তাকে এমন ভাবে মন দিয়ে ফেল না যে, তাকে না পেলে তোমার জীবনই বেকার হয়ে যাবে।

পরন্ত তার বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চেষ্টা কর। সফল না হলে তাকে মন থেকে মুছে দিয়ে অভিভাবকের ফায়সালাকে মাথা পেতে মেনে নাও। আর আল্লাহর কাছে আশা রেখে মনে মনে বলো যে, ‘আল্লাহ যা করেন, ভালই করেন।’

ফিল্ম দেখে, উপন্যাস পড়ে অথবা কোন মহিলার অভিজ্ঞতা শুনে কোন এক শ্রেণীর পুরুষের প্রতি কুধারণাকে মনের মাঝে বদ্ধমূল ক’রে রেখো না। নচেৎ সেই সন্দেহে তোমার জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। আর জেনে রেখো যে, প্রত্যেক দেশ, জাতি ও বংশের মধ্যে ভাল-মন্দ উভয়ই আছে। এখন তোমার ভাগ্যে কি আছে, তা কারো জানা নেই। সুতরাং তা আল্লাহর কাছেই চেয়ে নাও।

Close Menu