শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

আদর্শ মা


একটি শিশু এসে একটি নারীর জীবনকে ধন্য করে তোলে। একজন মহিলা আর এক জীবনে পদার্পণ করে মাতৃস্নেহ নিয়ে । সন্তানের প্রতি মাতার সে স্নেহের কথা লিখে বুঝানো অসম্ভব।

‘সমুদ্রের তল আছে পার আছে তার, অপার অগাধ মাতৃস্নেহ পারাবার।’

‘মার চেয়ে অধিক যার মায়া তাকে বলে ডাইনি।’ মায়ের থেকে বেশী ভাল আর কেউ বাসতে পারে?

নারীর প্রকৃত মহাত্ম্য আছে তার মাতৃত্বে।

সেক্সপিয়র বলেন, ‘এ পৃথিবীর বুকে মায়ের কোল অপেক্ষা অধিকতর মোলায়েম বিছানা আর কিছু নেই এবং তার সুস্মিত মুখশ্রী অপেক্ষা আর অন্য কোন ফুল অধিকতর সুন্দর নয়।’

অভিধানে সবচাইতে বড় মিষ্টি-মধুর কথা হল ‘মা।’

‘মা কথাটি মিষ্টি অতি কিন্তু জেনো ভাই,

মায়ের মত ক্রিভূবনে অন্য কিছু নাই।’

মা দেয় না চেয়ে, পেট ভরে না খেয়ে।

মার মায়াই মায়া, আর বট-ছায়াই ছায়া।

মা নাই যার, ঘাটে লা নাই তার।

যার মা নাই, তার গা নাই। যার বাপ নাই, তার দাপ নাই।

যে গৃহে মা নেই, সে গৃহে কোন আকর্ষণ নেই।

কিসের মাসি কিসের পিসী, কিসের বৃন্দাবন, মরা গাছে ফুল ফুটেছে মা বড় ধন।

শিশুর জন্য মায়ের তুল্য আর কে আছে?

প্রকৃত ‘মা’ সেই, যে সঠিক ভাবে সন্তান প্রতিপালন করে। ‘মা’ হওয়ার জন্য কেবল জন্মদাত্রী হওয়াই যথেষ্ট নয়। মায়ের কর্তব্য যে পালন করে না, মা হওয়ার যোগ্যতা তার নেই।

সন্তানকে সঠিক ভাবে তরবিয়ত দিলে ইহ-পরকালে উপকৃত হয় মা-বাপ। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেছেন, “আদম সন্তান মারা গেলে তার সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অবশ্য তিনটি আমল বিচ্ছিন্ন হয় না; সাদকাহ জা-রিয়াহ (ইষ্টাপূর্ত কর্ম), লাভদায়ক ইলম, অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে থাকে।” (মুসলিম ১৬৩১ নং প্রমুখ)

প্রকৃতির প্রথম ও প্রধান আইন হচ্ছে, মাতা-পিতাকে মান্য করা। কিন্তু বেশী কড়াকড়ি করলে শিশুরা বিদ্রাহী হয়ে ওঠে। ‘বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো’ হয়ে যায়। এই জন্য শিশু; যে আদর করে তাকে চিনে, কিন্তু যে ভালবাসে তাকে চিনে না।

শিশু ভিজে সিমেন্টের মত, তার উপর ভারী জিনিস পরলেই দাগ পড়ে যায়। কাঁচা অবস্থায় মাটিকে ভেঙ্গে যায়। পুড়ে পোক্তা হওয়ার পর আর সম্ভব নয়। শিশুকে ছোট থেকে তরবিয়ত দাও, বড় হলে আর পারবে না।

অবশ্য হিকমতের সাথে কাজ নিও। ছোট অবস্থায় তাদের জীবনের আমেজ নষ্ট করে দিও না। শুয়োপোকার গুটি থেকে প্রজাপতি যথা সময়ে বের হয়ে আসে। যদি সময়ের পূর্বে তাকে কেউ বের করতে চায়, তাহলে প্রজাপতি মারা যায়। অনুরূপ শিশুদের কে জীবন-সংগ্রাম করতে না দিয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধিকে ব্যাহত করলে তাদের ক্ষতি করা হয়।

তাদের কে নিজের হাতে খেতে-পরতে দাও, নিজের হাতে পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করার কথা শিক্ষা দাও এবং তাদের কাজ তুমি নিজে করে তাদের কে খোঁড়া ও নিজেকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলো না।

শিশু বড় হয়ে গেলে, তার সাথে আর শিশুর মত ব্যবহার করো না। তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে তোমার তরবিয়তে ধরণ পরিবর্তন হওয়া উচিত। জ্ঞানীরা বলেন, ‘শিশু বড় হলে তাকে ভাই মনে করো।’

ছেলেদের নষ্ট হওয়ার পশ্চাতে ক্রটির কথা বিচার করলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ ছেলেরাই তাদের মাতা-পিতার অবহেলা ও ক্রটির ফলে নষ্ট হয়ে থাকে।

হে আদর্শ জননী! ছেলেদের মাঝে, মেয়েদের মাঝে এবং অনুরূপ জামাই ও বউদের মাঝে ইনসাফ কর।

নু’মান ইবনে বাশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তার পিতা তাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দরবারে হাজির হয়ে বললেন, ‘আমি আমার এই ছেলেকে একটি গোলাম দান করেছি।

(কিন্তু এর মা আপনাকে সাক্ষী রাখতে বলে।)’ নবী (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার সব ছেলেকেই কি তুমি এরূপ দান করেছ?” তিনি বললেন , ‘না।’ নবী (সাঃ) বললেন, “তাহলে তুমি তা ফেরত নাও।”

অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্টা কর।” সুতরাং আমার পিতা ফিরে এলেন এবং ঐ সাদকাহ (দান) ফিরিয়ে নিলেন।

আর এক বর্ণনায় আছে, রসূল (সাঃ) বললেন, “হে বাশীর! তোমার কি এ ছাড়া অন্য সন্তান আছে?” তিনি বললেন, ‘জী হ্যাঁ।’ (রসূল সাঃ) বললেন, “তাদের সকলকে কি এর মত দান দিয়েছ?” তিনি বললেন, ‘জী না।’ (রসূল সাঃ) বললেন, “তাহলে এ ব্যাপারে আমাকে সাক্ষী মেনো না। কারণ, আমি অন্যায় কাজে সাক্ষ্য দেব না।“

অন্য এক বর্ণনায় আছে, “এ ব্যাপারে তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে সাক্ষী মানো।“ অতঃপর তিনি বললেন, “তুমি কি এ কথায় খুশী হবে যে, তারা তোমার সেবায় সমান হোক?” বাশীর বললেন, ‘জী অবশ্যই।‘ তিনি বললেন, “তাহলে এরূপ করো না।“(বুখারী ও মুসলিম)

সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে, উভয়ের স্নেহদাবী সমান। বেটা ভাল, তা জরুরী নয়। বেটাতে লেঠা লাগাতে পারে।

‘চাহি চাহি প্রাণ গেল করি বেটা বেটা,

সে বেটা মায়ের বুকে মেরে যায় ঝাঠা।‘

আর মেয়ে? তুমি ‘আদর্শ হলে, তোমার মেয়ে ‘আদর্শ’ হবে, এটাই স্বাভাবিক।

‘মা গুণে ঝি, গাই গুণে ঘি। বাপ গুণে বেটা, গাছ গুণে গোটা।‘ ‘যেই মত আটা হবে সেই মত রুটি, যেই মত মা হবে সেই মত হবে বেটি।‘ ‘ডিমের উৎকৃষ্টতা ডিম-প্রদানকারিণী মুরগীর উপর নির্ভর করে।‘

ছেলের চাইতে মেয়ের তরবিয়তগত দায়িত্ব মায়ের উপর বেশী। সৃষ্টিগত ও মনোগত পরিবর্তন ও হাব-ভাব মায়ের নজরেই স্পষ্ট হয়। যেহেতু মা-ই অধিকাংশ সময় মেয়ের পাশে থাকে। আর যেহেতু মেয়ের প্রতি ‘মায়ের স্নেহ অন্তর্যামী, তার কাছে তো রয় না কিছুই ঢাকা।‘

এই জন্য মেয়ের চরিত্র নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে মা অনেকাংশে দায়ী। কেননা, জেনেশুনে সে মেয়ের প্রশয় দেয় অথবা কলঙ্কের ভয়ে তার পাপ ও কাপ অনেক কিছু গোপন করে। ওদিকে তলায় তলায় মেয়ের ভ্রষ্টতা বেড়ে চলে। অবশেষে এমন এক সময় আসে, যখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না এবং আগুনের আঙ্গার আর আচল দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। তখন তোমার উদাসীন স্বামী তোমার হিসাব না নিলেও, হিসাবের দিন হিসাব থেকে রেহাই পাবে না।

ছেলে মেয়েদের ব্যাপারে বড় সতর্ক হও। তোমার ছেলের সাথে কোন মেয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ দেবে না। অনুরূপ তোমার মেয়ের সাথে কোন ছেলের সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ দেবে না। ভেবো না যে, পণের বাজার, ঘটে তো ঘটে যাক, পটে তো পটে যাক, বিনা খরচে বিয়েটা লাগে তো লেগে যাক। যেহেতু এমন আচরণ হীন মা-দেরই হতে পারে। যারা কোন লোভে মেয়েকে ব্যভিচারের পথে ছেড়ে দেয় এবং তার ভূমিকায় আত্মীয় যুবকের খুদমতে পেশ করে মেয়েকে। তার সাথে আজারে-বাজারে পাঠায়। হৃদয়ের আদান-প্রদানের সুযোগ দিতে বাড়িতে অবকাশ দেয়। রোমান্টিক নির্জনতা ঘটাতে তাদের নিকট থেকে নিজে দূরে সরে যায়! এমন মা নিজে মেয়ের কুটনী হয়!

ধিক্কার শত-কোটি ধিক্কার জানাই এমন নীচ মা-কে।

আদর্শ মা আমার! তোমার কোমল বুকে যদি সবল ঈমান থাকে, তাহলে পাপ দেখে চুপ থেকো না। চুপ থাকা বৈধ নয় তোমার জন্য। ছোট শিশুর হাতে আগুন লাগতে দেখে চুপ থাকবে? ছোট শিশু বা অন্ধকে পানিতে পড়তে দেখে চুপ থাকবে? কেমন মা তুমি; যদি তুমি নিজের দামাল শিশুকে বিপদ থেকে উদ্ধার না কর, থুথু তোমার মাতৃত্বে!

তোমার রসূল (সা:) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোন গর্হিত (বা শরীয়ত বিরোধী) কাজ দেখবে, তখন সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে। তাতে সক্ষম না হলে যেন তার জিহ্বা দ্বারা, আর তাতেও সক্ষম না হলে তার হৃদয় দ্বারা (তা ঘৃণা জানবে)। তবে এ হল সব চাইতে দুর্বলতম ঈমানের পরিচায়ক।“ (মুসলিম ৪৯নং, আহমাদ, আসহাবে সুনান)

মেয়েকে শাসন করতে গেলে মেয়ে তোমার উপর হয়? হতে পারে, হয়তো বা তুমি পাকের গোজ। তোমার ধারভার কিছু নেই। তুমি শাসানিতে যা বল, মেয়ে তা ভালই বুঝে, তাই কোন গুরুত্ব দেয় না। আর তার জন্যই কথায় বলে, ‘বিহনের (সকালের) বাদল বাদল নয়, মায়ে-ঝিয়ে কোঁদল কোঁদল নয়।‘

যে মা ডান হাতে করে শিশুর দোলনা হিলাতে পারে, সেই মা বাম হাতে করে পৃথিবী হিলাতে পারবে। মায়ের এক শক্তি আছে, সেই শক্তিকে তুমি কাজে লাগাও।

মায়ের হাতেই গড়বে মানুষ মা যদি সে সত্য হয়

মা-ই তো এ জাহানে প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়।

মা সকল নারীই হতে পারে। কিন্তু ‘আদর্শ মা’ খুব কম নারীই হয়ে থাকে। স্নেহময়ী পরমা গুণবতী বোনটি আমার! তুমি ‘আদর্শ মা’ হবে, এই কামনা করি।

Close Menu