শুরু করছি আল্লাহ্‌র নামে যিনি পরম করুনাময় অতি দয়ালু, মেহেরবান ও ক্ষমাশীল

স্বামীর কৃতজ্ঞ হও


সদিচ্ছাময়ী স্ত্রী আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করে। কৃতজ্ঞতা করে স্বামীর। আল্লাহর নবী (সাঃ) বলেন, “সে আল্লাহর শুকর আদায় করে না, যে মানুষের শুকর করে না”।( আহমাদ প্রমুখ)

মহানবী (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তিকে কোন উপহার দান করা হয় সে ব্যক্তির উচিত, দেওয়ার মত কিছু পেলে তা দিয়ে তাঁর প্রতিদান (প্রত্যুপহার) দেওয়া। দেওয়ার মত কিছু না পেলে দাতার প্রশংসা করা উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি (দাতার) প্রশংসা করে সে তাঁর কৃতজ্ঞতা (বা শুকরিয়া) আদায় করে, যে ব্যক্তি (উপহার) গোপন করে (প্রতিদান দেয় না বা শুকর আদায় করে) সে কৃতঘ্নতা (বা নাশুকরী) করে। আর যে ব্যক্তি এমন কিছু প্রকাশ করে যা তাকে দেওয়া হয়নি, সে ব্যক্তি দু’টি মিথ্যা লেবাস পরিধানকারীর মত।( তিরমিযী, আবূ দাঊদ, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান , সহীহ তারগীব ৯৫৪ নং)

আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, “আল্লাহ তাবারাকা অতাআলা সেই মহিলার প্রতি চেয়েও দেখবেন না, যে তাঁর স্বামীর কৃতজ্ঞতা আদায় করে; অথচ সে তাঁর মুখাপেক্ষিণী”।( নাসাঈ, ত্বাবারানী, বাযযার, হাকেম২/১৯০, বাইহাকী ৭/২৯৪, সিলসিলাহ ২৮৯ নং)

কথায় বলে, ‘মেয়ে লোকের এমনি স্বভাব, হাজার দিলেও যায় না অভাব’। স্বামীর কৃতঘ্নতা করা স্ত্রীর সহজাত অভ্যাস। হাজার করলেও অন্যের স্বামী তাঁর নজরে ভালো হয়। স্বামীর কৃতঘ্নতা (নাশুকরি) করা, তাঁর অনুগ্রহ ও এহসান ভোলা, তাঁর বিরুদ্ধে খামাকা নানান অভিযোগ তোলা , তাকে লানতান করা ইত্যাদি কারণেই নারী জাতির অধিংকাশই জাহান্নামী হবে। একদা নবী (সাঃ) (মহিলাদের কে সম্বোধন করে) বললেন, “হে মহিলা সকল! তোমরা সাদকাহ-খয়রাত করতে থাক ও অধিকমাত্রায় ইস্তিগফার কর। কারণ আমি তোমাদের কে জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসীরূপে দেখলাম”। একজন মহিলা নিবেদন করল, ‘আমাদের অধিকাংশ জাহান্নামী হওয়ার কারণ কি? হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, “তোমরা অভিশাপ বেশি কর এবং নিজ স্বামীর অকৃতজ্ঞতা কর। বুদ্ধি ও ধর্মে অপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও বিচক্ষন ব্যক্তির উপর তোমাদের চাইতে আর কাউকে বেশি প্রভাব খাটাতে দেখিনি”। মহিলাটি আবার নিবেদন করল, ‘বুদ্ধি ও ধর্মের ক্ষেত্রে অপূর্ণতা কি? তিনি বললেন, “দু’জন নারীর সাক্ষ্য একটি পুরুষের সাক্ষ্য সমতুল্য। ( প্রসবোত্তর খুন ও মাসিক আসার)দিনগুলিতে মহিলা নামায পড়া বন্ধ রাখে”।(মুসলিম)

স্বামীর নুন খেয়ে নিমকহারামি করা স্বভাব কিছু হতভাগী মহিলার । এদের মন যেন বলে, স্বামী যা করে, তা তাঁর জন্য ওয়াজেব ও জরুরী। অতএব তাতে আবার শুকরিয়া কি? যেমন এক নিমকহারাম সন্তান তাঁর মা-বাপকে বলেছিল, ‘সেরেফ পশুর ক্ষুধা নিয়ে নরনারী মিলন করলে সবারই প্রকৃতিগতভাবে সন্তান হয়, সেই কামনার সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য শুকরিয়া আবার কসের?!’

ভালবাসার বিনিময়ে স্বামী – স্ত্রী পরস্পরকে ভালবাসে। উপরন্ত স্বামী তাঁর স্ত্রীর যাবতীয় ভরণ পোষণ করে থাকে। তাঁর বিনিময়ে সে শুকরিয়া পাওয়ার হকদার নয় কি?

কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, অবিবাহিতা নারী একটি মনোমত স্বামী ছাড়া দুনিয়ার অন্য কিছু চায় না। কিন্তু যখনই স্বামী পায়, তখনই সে তাঁর নিকট থেকে সবকিছু চাইতে শুরু করে। পাওয়াতে ক্রটি বা বিলম্ব ঘটলে নানা লানতান শুরু করে।

স্ত্রী দেখে যে, তাঁর স্বামী তাঁর জন্য কী করছে। সে শুধু তাই দেখে যা তাঁর জন্য করা হয় না। তাই সামান্য ক্রটি হলে ‘কোনদিন ভালবাসলে না আমাকে, চিরজীবন যন্ত্রণা দিলে, সারা জীবন জ্বালিয়ে খেলে’ ইত্যাদি বলে সকল এহসান মুহূর্ত ভুলে বসে মহিলা। পান থেকে চুন খসলেই ফোঁস করে ফণা তোলে।

‘পিতামাতা সম বন্ধু আর কেহ নাই রে আর কেহ নাই রে,

সুখের সময়ে হয় সুহৃদ সবাই রে সুহৃদ সবাই রে।

শরীরার্ধ বল যারে সেই বনিতাই রে সেই বনিতাই,

নাগিনী বাঘিনী হয় যদি ধন নাই রে যদি ধন নাই রে।

মহানবী (সাঃ) বলেন, “আমি দেখলাম, জাহান্নামের অধিকাংশ অধিবাসী হল মহিলা”।

সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, তা কি জন্য হে আল্লাহর রসূল? বললেন, “তাদের কুফরীর জন্য”। তারা বললেন, আল্লাহর সাথে কুফরী? তিনি বললেন, “(না, তারা স্বামীর কুফরী(অকৃতজ্ঞতা) ও নিমকহারামি করে। তাদের কারো প্রতি যদি সারা জীবন এহসান কর, অতঃপর সে যদি তোমার নিকট সামান্য ক্রটি লক্ষ্য করে, তাহলে বলে বসে, তোমার নিকট কোন মঙ্গল দেখলাম না আমি!”(বুখারী,মুসলিম)

বুদ্ধিমতী বোনটি আমার! তুমি নিশ্চয় বলবে, আমি সে মেয়ে নই। আমি মার স্বামীর কৃতজ্ঞ।

তাহলে আরো শোনো, স্বামীর কৃতজ্ঞতা পাঁচভাবে আদায় হবেঃ-

১। স্বামীর দান ও অবধানের কথা মনের গভীর স্বীকার করবে। সেটা তোমার প্রাপ্য অধিকার মনে করবে না।

২। সে কথা প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করবে। আত্মীয় –স্বজনদের কাছে তাঁর নাম করবে। তবে গর্ব ক্রবে না এবং মিথ্যা প্রশংসা করবে না।

৩। তাঁর প্রতি বিনয়ী হবে। যেহেতু প্রত্যেক গ্রহীতা দাতার দাসে পরিণত হয়।

যার খাবে, তাকে তো আর দাত দেখানো চলে না।

৪। তাঁর প্রতি তোমার মহব্বত বাড়বে। প্রত্যেক দান প্রতিদান চায়। তোমার প্রতিদান হল, তাঁর প্রতি তোমার বর্ধমান প্রেম।

৫। তাঁর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির পথে দেওয়া জিনিস ব্যয় করবে ।যেমন, টেপ দিলে কুরআন শুনবে এবং গান-বাজনা শুনবে না। টাকা দিলে ভালো পথে ব্যয় করবে, খারাপ পথে নয়।

শুকরিয়া ও নাশুকরিয়ার একটি আদর্শ উদাহরণ ও তাঁর ফলাফল শোনঃ-

ইসমাঈলের বিবাহের পর ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর পরিত্যক্ত পরিজনকে দেখার জন্য মক্কায় এলেন। কিন্তু এসে ইসমাঈলকে পেলেন না। পরে তাঁর স্ত্রীর নিকট তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলেন। স্ত্রী বললেন, ‘তিনি আমাদের রুযীর সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন।’ এক বর্ণনা অনুযায়ী ‘আমাদের জন্য শিকার করতে গেছেন।’ আবার তিনি পুত্রবধুর কাছে তাদের জীবনযাত্রা ও অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বধু বললেন, ‘আমরা অতিশয় দুর্দশা, দুরাবস্থা, টানাটানি এবং ভীষণ কষ্টের মধ্যে আছি।’ তিনি ইব্রাহীম (আঃ) এর নিকট নানা অভিযোগ করলেন।

তিনি তাঁর পুত্রবধুকে বললেন, ‘তোমার স্বামী বাড়ি এলে তাকে আমার সালাম জানাবে এবং বলবে, সে যেন তাঁর ঘরের দরজার চৌকাঠ বদলে নেয়’। এই বলে তিনি চলে গেলেন।

ইসমাঈল যখন বাড়ি ফিরে এলেন, তখন তিনি ইব্রাহীমের আগমন সম্পর্কে একটা কিছু ইঙ্গিত পেয়ে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের নিক্কত কেউ কি এসেছিলেন?’

স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, এই এই আকৃতির একজন বয়স্ক লোক এসেছিলেন। আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তাকে আপনার খবর দিলাম। পুনরায় আমাকে আমাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, আমি তাকে জানালাম যে, আমরা খুবই দুঃখ-কষ্ট ও অভাবে আছি’। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ‘তিনি তোমাকে কোন কিছু অসিয়ত করে গেছেন কি?’ স্ত্রী জানালেন, ‘হ্যাঁ, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আপনাকে তাঁর সালাম পৌছাতে এবং বলেছেন, আপনি যেন আপনার দরজার চৌকাঠ বদলে ফেলেন’। ইসমাঈল (আঃ) বললেন, ‘তিনি ছিলেন আমার পিতা এবং তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়ে গেছেন, যেন তোমাকে আমি তালাক দিয়ে দিই। কাজেই তুমি তোমার বাপের বাড়ি চলে যাও’।

সুতরাং ইসমাঈল (আঃ) তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং ‘জুরহুম’ গোত্রের অন্য একটি মেয়েকে বিবাহ করলেন। অতঃপর যতদিন আল্লাহ চাইলেন ইব্রাহীম (আঃ) ততদিন এদের থেকে দূরে থাকলেন। পরে আবার দেখতে এলেন। কিন্তু ইসমাঈল (আঃ) সেদিনও বাড়িতে ছিলেন না। তিনি পুত্রবধূর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং ইসমাঈল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। স্ত্রী জানালেন, ‘তিনি আমাদের খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে গেছেন’। ইব্রাহীম (আঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কেমন আছ?’ তিনি তাঁর নিকট তাদের জীবন যাত্রা ও সাংসারিক অবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাইলেন। পুত্রবধু উত্তরে বললেন, ‘আমরা ভাল অবস্থায় এবং সচ্ছলতার মধ্যে আছি’। এ বলে তিনি আল্লাহ্র প্রশংসাও করলনে। ইব্রাহীম (আঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের প্রধান খাদ্য কি?’ পুত্রবধূ উত্তরে বললেন, ‘গোশ্ত’। বললেন, তোমাদের পানীয় কি?’ বধূ বললেন, ‘পানি’। ইব্রাহীম (আঃ) দুআ করলেন, ‘হে আল্লাহ! এদের গোশ্ত ও পানিতে বরকত দাও।

আলাপ শেষে ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রবধূকে বললেন, ‘তোমার স্বামীকে আমার সালাম বলবে এবং তাকে আমার পক্ষে থেকে হুকুম করবে, সে যেন তাঁর দরজার চৌকাঠ বহাল রাখে’।

অতঃপর ইসমাঈল (আঃ) বাড়ি এসে স্ত্রীকে জিজ্ঞসা করলেন, ‘তোমাদের নিকট কেউ এসেছিলেন কি?’ স্ত্রী বললেন, ‘হ্যাঁ, একজন সুন্দর আকৃতির বৃদ্ধ এসেছিলেন।

তিনি আপনার সম্পর্কে জানতে চাইলেন, আমি তখন তাকে আপনার খবর বললাম।

অতঃপর তিনি আমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি তাকে খবর দিলাম যে, আমরা ভালই আছি’। স্বামী বললেন, ‘আর তিনি তোমাকে কোন অসিয়ত করেছেন কি?’ স্ত্রী বললেন, ‘তিনি আপনাকে সালাম বলেছেন এবং আপনার দরজার চৌকাঠ অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশ দিয়ে গেছেন’। ইসমাঈল (আঃ) তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘তিনি আমার আব্বা, আর আর তুমি হলে চৌকাঠ। তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন, আমি যেন তোমাকে স্ত্রী হিসাবে বহাল রাখি’।(বুখারী)

Close Menu