আবু হুরাইরাহ Abu Hurairah

আবু হুরাইরাহ (রাঃ)

আবু হুরাইরাহ Abu Hurairah

আবদুর রহমান ইবনে সখর আদ-দৌসি[১] বা আবু হুরায়রা[২] أبىْ هريْرة رضى الله عنْه) নবী মুহাম্মাদ (সা:)-এর একজন সাহাবা ও সেবক ছিলেন যার প্রকৃত নাম আবদুর রহমান ইবনে সাখর অথবা উমায়র ইবনে আমির।[৩] তিনি আসহাবুস সুফফার একজন সদস্য ছিলেন এবং একনিষ্ঠ জ্ঞান পিপাসু ছিলেন।

তিনি তিন বছর নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সান্নিধ্যে ছিলেন এবং বহুসংখ্যক হাদিস আত্মস্থ করেন এবং বর্ণনা করেন। হিসাব অনুযায়ী, ৫,৩৭৪ টি হাদিস তার কাছ থেকে লিপিবদ্ধ হয়েছে। বলা হত যে, উর্বর মস্তিষ্ক ও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি।

তার কাছ থেকে আটশত তাবেঈ হাদিস শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

নাম পরিবর্তনের ইতিহাস

আবু হুরাইরাহর ইসলাম গ্রহণের আগে নাম ছিলো আবদু শামস। ইসলাম গ্রহণের পরে মুহাম্মাদ (সঃ) তার নাম পরিবর্তন করে রাখেন আবদুর রহমান। ছোট বেলায় তিনি একটি বিড়াল শাবকের সাথে তিনি সবসময় খেলতেন।

তা দেখে তার বন্ধুরা তার নাম দেন আবু হুরাইরা (বিড়াল শাবকওয়ালা)। আস্তে আস্তে এ নামেই তিনি সকলের মাঝে পরিচিত হন এবং তার আসল নামটি অপ্রচলিত হয়ে পড়ে।

মুহাম্মাদ সাঃ তাকে মাঝে মধ্যে আবু হিররিন বলে ডাকতেন। আরবি ভাষায় হুরাইরাহ স্ত্রী লিঙ্গ আর হিররিন পুং লিঙ্গ। হুরাইরাহ শব্দের অর্থ বিড়ালছানা। আবু হুরাইরাহ শব্দের অর্থ বিড়ালছানার পিতা।

প্রাথমিক জীবন

আবু হুরায়রা (রা.) ইয়েমেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৫৯৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ৬৭৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

ইসলাম গ্রহণ

আবু হুরাইরা (রা) ইসলামে দীক্ষিত হন প্রখ্যাত সাহাবী তুফায়িল ইবন আমর আদ-দাওসীর হাতে। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি স্বীয় দাওস গোত্রের সাথেই অবস্থান করতে থাকেন। ষষ্ঠ হিজরী সনে তার গোত্রের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে তিনি মদীনায় এসে মুহাম্মাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে আমর ইবনুর গালাস বলেন, তিনি বছর ৭ম হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

মদিনা আসার পর তিনি দিন রাত ২৪ ঘণ্টা হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর সাহচার্যে থাকতেন, এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর জীবদ্দশায়, তখনো আবু হুরাইরাহ বিবাহ করেননি। বাড়িতে শুধু তার বৃদ্ধা মা ছিলো। এই বৃদ্ধা হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর দোয়ার কারণে ইসলাম কবুল করেন।

হাদিস বর্ণনাকারী হিসাবে

আবু হুরাইরাহ নিজে জ্ঞান অর্জন করতে ও জ্ঞান বিতরণ করতে ভালোবাসতেন। এইজন্য তিনি সবসময় মুহাম্মাদের থেকে তার মুখ নিসৃত কথা হাদিস শুনতেন। মুহাম্মাদ থেকে এত বেশি হাদীস বর্ণনার ব্যাপারটি অনেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতো।

তাই তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা হয়তো মনে করছো আমি খুব বেশি হাদিস বর্ণনা করি। কিন্তু আমি ছিলাম রিক্তহস্ত, দরিদ্র, পেটে পাথর বেঁধে সর্বদা মুহাম্মাদের সাহচর্যে কাটাতাম। আর মুহাজিররা ব্যস্ত থাকতো তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং আনসাররা তাদের ধন-সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে।[৪]

তিনি আরও বলেন, ‘‘একদিন আমি বললামঃ ‘ইয়া মুহাম্মাদ, আমি আপনার অনেক কথাই শুনি, কিন্তু তার অনেক কিছুই ভুলে যাই।’ একথা শুনে মুহাম্মাদ বললেন, ‘তোমার চাদরটি মেলে ধরে বুকের সাথে লেপ্টে ধর। এরপর থেকে আর কোন কথাই আমি ভুলে যাইনি।[৫]

দারিদ্র্যতায় জর্জরিত

জ্ঞান অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগের কারণে ও সবসময় মুহাম্মাদের মজলিসে উপস্থিত ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদানের কারণে জীবনে তিনি এত ক্ষুধা ও দারিদ্র সহ্য করেছেন যে তার সমকালীনদের মধ্যে কেউ তা করেননি।

তিনি ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত দারিদ্র্য ছিলেন, এই জন্য মসজিদে নববী নামাজ পড়ার সময় তিনি সবার সাথে কোন কারণ ব্যতীতই কথা বলার চেষ্টা করতেন শুধু এই কারণে, তারা হয়তো তার ক্ষুধার্থ অবস্থা বুঝে তাকে খাওয়ার জন্য ডাকবে। আবার তিনি লোকজনের চলার পথেও দাড়িয়ে থাকতো, কেও যদি তাকে ডেকে নিয়ে খেতে দেয়।

অল্প কালের মধ্যেই মুসলমানদের হাতে ধন ও ঐশ্বর্য আসে। চতুর্দিক থেকে গনিমাতের মাল মুসলমানদের হাতে আসতে থাকে। আবু হুরাইরা অর্থ, বাড়ী, ভূ-সম্পত্তি, স্ত্রী ও সন্তানাদি- সবকিছুর অধিকারী হন। তবে তিনি সবসময় বলতেন, আমি ইয়াতীম অবস্থায় বড় হয়েছি, রিক্ত হস্তে হিজরাত করেছি।

মৃত্যুবরণ

অন্তিম রোগ শয্যায় মারওয়ান ইবনুল হিকাম তাকে দেখতে এসেছিলেন। মারওয়ান তার সাথে সাক্ষাৎ এর পরপরই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেন, ওয়ালিদ বিন উকবা’ আসরের নামাযের পর তার জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর, আবু সাঈদ খুদরী প্রমুখ সাহাবী তার জানাযায় উপস্থিত ছিলেন।

ওয়ালিদ ইবনে উকবা তার মৃত্যুর খবর হযরত মুয়াবিয়ারকে অবহিত করলে তিনি তাঁকে লিখেন, তার উত্তরাধিকারীদের খুজে বের করে দশ হাজার দিরহাম দাও এবং তাঁর প্রতিবেশীদের সাথে সদাচরণ কর। কারণ, উসমানের গৃহবন্দী অবস্থায় তিনি তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।

আল্লামা ইবনে হাজার আসকিলানী ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে আবু সুলাইমানের সুত্রে উল্লেখ করেছেন, আবু হুরাইরা ৭৮ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। ওয়াকিদীর মতে তাঁর মৃত্যুসন ৫৯ হিজরী, তবে ইমাম বুখারীর মতে তার মৃত্যুসন হিজরী ৫৭। মদীনার অদূরে ‘কাসবা’ নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন।

গুণাবলী

ইবাদত

অগাধ জ্ঞান, সীমাহীন বিনয় ও উদারতার সাথে আবু হুরাইরার মধ্যে তাকওয়া ও আল্লাহপ্রীতির এক পরম সম্মিলন ঘটেছিল। তিনি দিনে রোযা রাখতেন, রাতের তিন ভাগের প্রথম ভাগ নামাযে অতিবাহিত করতেন। তারপর স্ত্রীকে ডেকে দিতেন।

তিনি রাতের দ্বিতীয় ভাগ নামাযে কাটিয়ে তাদের কন্যাকে জাগিয়ে দিতেন। কন্যা রাতের বাকী অংশটুকু নামাযে দাঁড়িয়ে অতিবাহিত করতেন। এভাবে তাঁর বাড়ীতে সমগ্র রাতের মধ্যে ইবাদত কখনও বন্ধ হতো না। ইকরিমা ইবনে আবু জাহল বলেন, আবু হুরাইরা প্রতিদিন বার হাজার বার তাসবীহ পাঠ করতেন।

আবু হুরাইরার একটি নিগ্রো দাসী ছিল। একদিন তার অশোভন আচরণের কারণে তার পরিবারের সবাই দুঃখ পান, এবং পরিশেষে তিনি তাকে আযাদ করে দেন।

বয়স্কদের সম্মান

তার মা যতদিন জীবিত ছিলেন আবু হুরাইরা তার সাথে সর্বদা সদাচরণ করেছেন। তিনি সবসসময় বাড়ি পৌঁছে মাকে সালাম করতেন। আবু হুরাইরা নিজে যেমন মুরুব্বিজনদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন, তেমনি সকলকে তিনি উপদেশ দিতেন মাতাপিতার সাথে সদাচরণের, আত্মীয় স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক কায়েম রাখার উপদেশ দিতেন।

জ্ঞান চর্চা

আআবু হুরাইরাহ Abu Hurairah

মুহাম্মাদ ও তার নিসৃত কথার প্রতি প্রচণ্ড নিবেদিত ছিলেন। জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞানচর্চা তার অভ্যাস ও প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল।

যায়িদ বিন সাবিত বলেন, একদিন আবু হুরাইরাহ,আমাদের এক বন্ধু ও আমি মসজিদে আল্লাহর কাছে দু’আ করছিলাম। ইতিমধ্যে মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যে উপস্থিত হলে, আবু হুরাইরাহ সেই দিন দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে চাই, আমার দুই বন্ধু যা দোয়া করেছে। আর সেইসাথে চাই এমন জ্ঞান যা কখনও ভুলে যাবোনা।

দানশীলতা

আআবু হুরাইরাহ Abu Hurairah

দানশীলতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন, তার মেয়ে তার নিকট সোনার গহনা বানিয়ে চাইলে, তিনি এটি দিতে চাননি, বরং বলেছেন, আমার সম্পদ আমি আল্লাহ্‌র রাস্তায় খরচ করতে পছন্দ করি।

একদিন মারওয়ান ইবনুল হাকাম ১০০ দিনার আবু হুরাইরার কাছে পাঠালেন। কিন্তু পরের দিনই মারওয়ান আবার লোক পাঠিয়ে জানালেন, ‘আমার চাকরটি ভুলক্রমে দিনারগুলি আপনাকে দিয়ে এসেছে, ওগুলি আমি আপনাকে দিতে চাইনি, বরং অন্য এক ব্যক্তিকে দিতে চেয়েছিলাম।’ একথা শুনে আবু হুরাইরা লজ্জা ও বিস্ময়ের সাথে বললেন, ‘আমি তো সেগুলি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে ফেলেছি। আগামীতে বাইতুল মাল থেকে যখন আমার ভাতা দেওয়া হবে, সেখান থেকে নিয়ে নেবেন।

মুহাম্মাদ (সা) ইন্তিকালের পর

দ্বিতীয় খলীফা উমর রাঃ আবু হুরাইরাকে বাহরাইনের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। পরে তাকে অপসারণ করেন।

তারপর আবার নিযুক্ত করতে চাইলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং মদীনা ত্যাগ করে আকীক নামক স্থানে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন।

হযরত মুয়াবিয়ার শাসনামলে আবু হুরাইরা একাধিকবার মদীনার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন।

তবে শাসন ক্ষমতা তাঁর স্বভাবগত মহত্ব, উদারতা ও অল্পেতুষ্টি ইত্যাদি গুণাবলীতে কোন পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারেনি।

তথ্যসূত্র

wikipedia

আমাদের সোশ্যেল মিডিয়া লিংক

Facebook | Twitter |

Leave a Reply