ইমাম তাইমিয়া দামেস্কের দুর্গে আটক

ইমাম তাইমিয়া দামেস্কের দুর্গে আটক

ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন এবং গ্রন্থ রচনায় ব্যাপৃত হয়েছিলেন সত্য কিন্তু শত্রুরা তাঁকে নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করতে দিল না।

তারা আবার তাঁকে কারাগারে পাঠাবার ব্যবস্থা করলো।

সংগ্রাম সংঘাতে যার জীবন পরিপূর্ণ তিনি কেমন করে নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতে পারেন।

অন্যায় ও অসত্যের রাজত্বে নির্বিঘ্নে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারেন।

আর তার চাইতে বড় কথা হচ্ছে, সমকালীন ইলমী ময়দানে তাঁর যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল তা জন্ম দিয়েছিল তাঁর একদল স্থায়ী শত্রুর।

তার সব সময় তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতো।

তাঁকে কিভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা যায়,

কিভাবে তার কহতি করা যায়,

তাঁর বক্তব্যের বিকৃত ব্যাখ্যা করে তাঁকে নতুন ইসলাম আমদানীকারী,

হিংসা বিদ্ব্যেশ

বুযর্গানে দীনের অবলম্বিত পথের বিরুদ্ধাচরনণকারী এবং ইসলামের অভিনব ও বিকৃত ব্যাখ্যা দাতা হিসেবে চিত্রিত করাই ছিল তাদের কাজ।

আর দুর্ভাগ্যবশত সরকার যন্ত্রের চারপাশে এ ধরনের স্বার্থান্ধ আলেমদের ভিড় জমে বেশি।

একদল আলেম সরকারী স্বার্থের কাচে নিজেদের দীন ও ঈমান বিক্রি করে সরকারের চাহিদা মতো ইসলামকে কাটছাঁট করতে গিয়ে নিজেদের আল্লাহ প্রদত্ত প্রকৃতির মধ্যেও কাটছাঁট করতে থাকে।

এভাবে এমন এক পর্যায় আসে যখন তারা আর স্বাভাবিক মানবিক অবস্থায় টিকে থাকেতে পারেনা,

মানুষের আকৃতিতে তখন তারা হয়ে উঠে অমানুষ।

হিংসা, বিদ্বেষ, ক্রড়তা, নৃশংসতা, নির্মমতার বন্য স্বভাবগুলো তাদের মধ্যে প্রতিফলিত হতে থাকে।

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তারা নিজেদের হিংস্র আক্রোশ উদগীরণ করেই ক্ষান্ত হয় না।

তাকে লাঞ্ছনার শেষ পর্যায়ে উপনীত না করে তাদের মনে শান্তি আসেনা।

আবার প্রতিপক্ষ যদি ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা দাতা হবার সাথে সাথে কেবলমাত্র তাত্ত্বিক পর্যায়ে অবস্থান করে তাহলেও তাদের আক্রোশ ততটা ফুসে ওঠে না।

তারা ওটাকে কোনক্রমে হজম করে নয়ে।

কিন্তু তাত্ত্বিক পর্যায় অতিক্রম করে সঠিক ইসলামকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রতিপক্ষের প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের সূচনা হতেই বা এর কোন কর্মসূচী হাতে নিতেই তাদের গাত্রদাহ শুরু হয়।

তারা মারমুখী হয়ে ওঠে।

কারণ তারা মনে করে এর আঘাতে সর্বপ্রথম তাদের স্বার্থের প্রাসাদ ধ্বসে পড়বে।

মুসলিম জনতার সাম তাদের কৃত্রিম নেকী ও ভেজাল ইসলাম ধরা পড়ে যাবে।

নিজেদের স্বার্থচিন্তার বাইরে দ্বিতীয় বৃহত্তর কিছু চিন্তা করার অবকাশ তাদের নেই।

ইমামের লেখনি

নবুওয়তের সাতশো বছর পর ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহে আলাইহি ইসলামের যথার্থ রূপটি শুধুমাত্র তাত্ত্বিক পর্যায়ে তুলে ধরে গুটিকয় বইপত্র লিখে ও ফতোয়া দিয়ে বসে থাকেননি।

বরং এই সংগে তিনি ইসলামের এই যথার্থ রূপ মুসলিম জনগণের আকীদা বিশ্বাস পুনর্গঠনের কাজও চালিয়ে যান।

তাঁর ছাত্র ও সমর্থক জনগোষ্ঠীকে নিয়ে তিনি একটি দুর্বার গণবাহিনীও গড়ে তোলেন।

এ গণবাহিনীর সাহায্যে সমাজকে শিরক, বিদআত ও দুনীতির বিষ বাষ্প থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালান।

এমনকি এর মাধ্যমে সরকারের উপরও প্রভাব বিস্তার করেন।

তবে যদি সরকার পরিবর্তন করার কোন পরিকল্পনা বা কর্মসূচী তাঁর থাকতো তাহলে আমাদের বিশ্বাস কোন সরকারও তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল ও তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হতো না।

তখন সরকারও তাঁর প্রতি হতো মারমুখী।

তখন আলেমদের পরামর্শ সরকার তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করতো না বরং সরকারের প্ররোচনায় ও নির্দেশে আলেমগণ তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিতেন।

মূলত আমাদের বক্তব্য হচ্ছে স্বার্থান্ধ আলম সমাজ ও ইসলামী খিলাফতের আদর্শ থেকে বিচ্যুত সরকার হামেশা সঠিক ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে এসেছে।

সঠিক ইসলামের প্রবক্তারা সবসময় এদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে এসেছে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া সারাজীবন এদের হাতে লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হয়ে এসেছেন।

কাজেই শেষবারের মতো তাঁকে ৭২৬ হিজরির ৭ শাবান দামেস্কের দুর্গে আটক করা হলো।

এ আটকের নির্দেশে ইমাম হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন।

তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠেছিলেনঃ

আনা কুনতু মনতাযিরান যালিকা, ওয়া হা যা ফীহেগ খা্ইরুন কাসীরুন ওয়া মাসালিহাতুন কারবীরাহ।

অর্থাৎ আমিতো এর অপেক্ষায় ছিলাম,এর মধ্যে বিরাট কল্যাণ নিহিত ও এর তাৎক্ষনিক প্রয়োজন রয়েছে।

ইমামের খেদমত করার জন্য তার ছোট ভাই জয়নুদ্দীন ইবনে তাইমিয়াও গভর্নরের অনুমতিক্রমে কারাগারে তাঁর সাথে অবস্থান করতে থাকলেন।

ইমামের কারারুদ্ধ হবার পর শত্রু পক্ষ ইমামের দলবলের ওপর ও হাত উঠালো।

বিভিন্ন স্থানে তারা আক্রমণ চালালো।

ইমামের একদল সমর্থককে গ্রেফতার করে গাধার পিঠে চড়িয়ে শহর প্রদক্ষিণ করালো।

অবশেষে প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে নির্দেশ হাসিল করে একদল সমর্থককে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করলো।

কিছু দিন পর আবার তাদের মুক্তি দেয়া হলো।

কিন্তু ইমামের শ্রেষ্ঠ শাগরিদ আল্লামা হাফেজ ইবনে কাইয়েম তাঁর সাথে থাকলেন।

বিদাতিদের আনন্দ উল্লাস

ইমামের কারাদণ্ড একদল বিকৃতমনা ইসলাম ব্যবসায়ীর মনে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিলেও হক্কানী আলেম সমাজ ও সাধারণ মুসলমান এ ঘটনায় ভীষণ মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ হলো।

তারা একে সুন্নাতের মোকাবিলায় বিদআতের এবং হকের মুকাবিলায় বাতিলের বিজয় মনে করলো।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রেষ্ঠ আলেমগণ কায়রোয় সুলতানের কাছে পত্র পাঠাতে লাগলেন।

তাঁরা যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম ও ইসলামের শক্তিশালী কণ্ঠকে এভাবে কারাগারে আটক রাখার বিরুদ্ধে নিজেদের আন্তরিক ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।

কেবলমাত্র বাগদাদের আলেমগণ সম্মিলিতভাবে যে স্মারকলিপি সুলতানের কাছে পাঠান তার একটা অংশ এখানে উদ্ধৃত করছিঃ

শায়খুল ইসলাম তাকীউদ্দীন আহমদ ইবনে তাইমিয়ার ওপর জুলুম করা হচ্ছে শুনে পূর্ব এলাকার দেশগুলো এবং ইরাকের ইসলাম প্রিয় দীনদার লোকেরা ভীষণ মর্মাহত হয়েছে অন্য দিকে ইসলাম বিরোধীরা আনন্দে নাচতে শুরু করেছে।

স্বার্থবাদী ও বিদআতি মহলও এতে খুশি হয়েছে।

এসব এলাকার আলেমগণ যখন দেখলেন বিদআতি ও বাতিল পন্থীরা আলেমদের লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগে আনন্দে হাততালি দিয়ে বেড়াচ্ছে তখন তারা এ অবাঞ্ছিত ঘটনাটির খবর সরকারকে দেয়া জরুরী মনে করলো।

এই সাথে তারা শায়খের ফতোয়ার সমর্থনে নিজেদের জবাবও লিখে পাঠাচ্ছে।

তারা শায়খের ইলম, জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের মনোভাব ও এখানে ব্যক্ত করেছে।

এসব কিছুর মূলে দীনকে মর্যাদাশালী দেখার ও সুলতানের প্রতি কল্যাণ কামনার মনোভাব ছাড়া আর কিছুই নেই।

Leave a Reply