ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সংগ্রামী জীবন

ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সংগ্রামী জীবন

সাতশো বারা হিজরিতে আবার তাতারীদের আক্রমণের খবর শোনা গেলো।

তার বিশা সেনাবাহিনী নিয়ে দামেস্কের দিকে এগিয়ে আসছে।

তাতারী আক্রমণ প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলে সুলতান নাসিরুদ্দিন কালাউন।

তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে সিরিয়ার পথে রওনা হলেন জিহাদের নিয়তে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়াও হলেন সেনাবাহিনীর সহযোগী। কিন্তু সিরিয়ায় পৌঁছে তারা শুনলেন তাতারীরা ফিরে গেছে।

সেনাবাহিনী ফিরে গেলো মিসরে। কিন্তু ইমাম ইবনে তাইমিয়া দামেস্কে থেকে গেলেন।

তালাকের ঝগড়া

দীর্ঘ সাত বছর পর ইমাম দামেস্কে ফিরে এসেছিলেন। দামেস্কবাসীরা তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানালো। হাজার হাজার লোক নগরীর বাইরে এসে তাঁকে স্বাগত জানালো।

বিপুল সংখ্যক মহিলাও এ অভ্যর্থনায় অংশ নিয়েছিল। জিহাদে অংশ গ্রহণের সুযোগ না পেয়ে ইমাম বাইতুল মাকদিস যিয়ারতের নিয়ত করলেন।

বায়তুল মাকদিসে কিছুদিন অবস্থান করে সেখান থেকে আরো বিভিন্ন এলাকা সফর শেষে দামেস্কে ফিরে এলেন।

এখানে তিনি আবার নিজের অধ্যাপনা, জ্ঞান চর্চা ও সংস্কারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। এ পর্যায়ে তিনি ফিকহ শাস্ত্র আলোচনা ও এর বিভিন্ন মাসায়েল বিশ্লেষণের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিলেন।

ইমাম ও তার পূর্ব পুরুষরা ছিল হাম্বলী মযহাবের অনুসারী।

কিন্তু এ স্বত্বেও তিনি স্বাধীনভাবে মাসায়েল আলোচনা করতেন এবং বিভিন্ন মাসায়েল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সহীহ হাদিসের প্রতি নজর রাখতেন।

কাজেই বিভিন্ন মাসায়েলে হাম্বলী মযহাবসহ অন্যান্য মযহাবের সাথেও তাঁর বিরোধ বাধে। এমনি একটি বিরোধীয় বিষয় ছিল তাঁর এক বৈঠকে তিন তালাকের তিন তালাক হওয়ার বিষয়টি।

চার মযহাবসহ অন্যান্য বহু ইমাম এ বিষয়ে একমত ছিলেন।

কিন্তু ইমাম এর বিরোধিতা করেন। তাঁর পক্ষে সহি হাদিস সহ কতিপয় প্রথম শ্রেণীর সাহাবীর মতও ছিল। মূলত এটি ছিল একটি ফিকহী বিরোধ।

আর ইসলামী ফিকহে এ ধরনের বিরোধের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু বিরোধী পক্ষের সংকীর্ণমনতা এতটুকুও বরদাশত করতে রাজী ছিল না।

ইমামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের জোয়ার উঠলো। কিন্তু ইমাম নিবিষ্ট মনে নিজের কাজ করে যেতে লাগলেন।

ইসলামী ফিকহ একটি চলমান ও গতিশীল প্রতিষ্ঠান।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান।

কিয়ামত পর্যন্ত এ জীবন বিধান নিজেকে স্বকীয় জীবন ধারায় প্রতিষ্ঠিত রাখবে। এ চির প্রতিষ্ঠার মূলে রয়েছে এই ফিকহের গতিশীলতা।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া ইসলামী ফিকহের এই গতিশীলতা অপরিবর্তিত রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

ইসলামী ফিকহ স্থবিরত্বে পৌঁছে গেলে, ইজতিহাদ ও ইসতিমবাতের ধারা শুকিয়ে গেলে নতুন নতুন সমস্যার যথাযথ ইসলামী সমাধান দিতে সক্ষম না হলে ইসলামকে পূর্ণ অবয়বে কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা কোনক্রমেই সম্ভব হবে না। তাই ইমামের অবদান এ ক্ষেত্রে অসামান্য ও অতুলনীয়।

কিন্তু অন্ধকারে থাকতেই যারা অভ্যস্ত, দিন দুপুরের ঝলমলে আলো তারা সহ্য করবে কেমন করে? তাই জায়েজ সীমার মধ্যে অবস্থান করে তাঁর স্বাধীন মত প্রকাশকে বিরোধী পক্ষ বরদাশত করতে পারলোনা।

এ সময়ে হলফ বিত তালাকের বিষয়ের আলোচনা চলছিল জোরেশোরে।

লোকেরা বিভিন্ন ব্যাপারে বিশেষ করে লেন দেনের ক্ষেত্রে তালাক শব্দ ব্যবহার করতো খুব বেশি করে।

কোন বিষয়ে জোর দেবার জন্য বা নিজের দৃঢ় সংকল্প, সদিচ্ছা ও অঙ্গীকারের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য লোকেরা বলতো, আমি অবশ্যই এমনিটি করবো, নয়তো আমার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে।

আমি অবশ্যই উমুক তারিখে তোমাকে টাকাটা দেবো, নয়তো আমার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে। অথবা আমি যদি এ পণ্য দ্রব্যটি এত টাকায় না কিনে থাকি তাহলে আমার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে।

এ ধরনের বিভিন্ন কথায় ও অঙ্গীকারে তালাক দেয়ার কোন নিয়তই লোকদের শর্তাধীন তালাক বা তালাক বিশশর্ত মনে করে এর ওপর তালাকের বিধান জারি করা হতো।

এভাবে শত শত সংসার ও পরিবার উজাড় হয়ে যাচ্ছিল।

আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এ শব্দটির ব্যবহার চলছিল ব্যাপকভাবে।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জামানা থেকে সরকারের প্রতি অনুগত্যকে পাকাপোক্ত করার জন্য বাইয়াতের সংগে তালাক শব্দও ব্যবহারের রেওয়াজ চলে আসছিল।

লোকেরা বলতো: আমি যদি উমুক শাসকের প্রতি আনুগত্য পরিহার করি তাহলে আমার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে।

এ বিষয়টি সমাজে বিরাট বিশৃঙ্খলা ও জটিলতা সৃষ্টি করেছিল।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ বিষয়টির ওপর ব্যাপক চিন্তা গবেষণা করেন।

অবশেষে তিনি একটাকে নিছক একটি হলফ ও অঙ্গীকার বলে গণ্য করেন।

এ অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে শুধুমাত্র কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে বলে তিনি ঘোষণা করেন, এর ফলে কোনক্রমেই স্ত্রী তালাক হবে না।

তার এ ফতোয়াটিও প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে পড়ে। ফলে বিভিন্ন মযহাবের উলামা ও কাযীরা তার বিরোধী হয়ে পড়েন।

এ ফতোয়া প্রত্যাহার করার জন্য তাঁর উপর চাপ প্রদান করা হয়।

প্রধান বিচারপতি শামসুদ্দীন ইবনে মুসলিম তাঁর সাথে সাক্ষাত করে হলফ বিত তালাকের ব্যাপারে ভবিষ্যতে ফতোয়া না দেবার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানান।

তিনি রাজী হয়ে যান।

ইত্যবসরে এ ফতোয়া দান থেকে বিরত রাখার জন্য মিসর থেকে সুলতানের ফরমানও এসে যায়। হাংগামা, গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় তিনি তাদের এ খায়েশ মেনে নেন।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ইমাম তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

মনে হয় পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর মনে এ চিন্তা আসে যে, শরীয়তের ব্যাপারে (কুরআন ও সুন্নাহর আলাকে তিনি যেটাকে সত্য মনে করেছেন) তার সত্য রায়কে হুকুমতের নির্দেশে গোপন রাখা জায়েজ নয়

এবং এ ব্যাপারে এ ধরণের হুকুমতের যা খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবওয়াত নয় নির্দেশ মেনে চলা অনুচিত।

তাই কিছুদিন পরে লোকদের প্রশ্নের জবাবে ইমাম এ ব্যাপারে আবার ফতোয়া দিতে থাকেন।

ফলে উলামা ও কাযীরা আবার তাঁর বিরোধী হয়ে ওঠেন।

তাঁদের সম্মিলিত আবেদনের ফলে গভর্নর তাকে দুর্গের মধ্যে নজরবন্দী করে রাখার নির্দেশ দেন।

এ নির্দেশ অনুযায়ী ৭২০হিজরীতে তিনি কারারুদ্ধ হন।

কিন্তু এবারের কারাবাস মাত্র ৫মাস স্থায়ী হয়।

মিসর থেকে সুলতানের নির্দেশ আসায় কারাগারে প্রবেশের পাঁচ মাস পরে তিনি তা থেকে বের হয়ে আসেন।

এরপর প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর তিনি জ্ঞান চর্চায় তেমন বিশেষ কোন বাধা পাননি।

এ সাড়ে পাঁচ বছর তিন অধ্যাপনা, গ্রন্থ রচনা ও বক্তৃতার মাধ্যমে মুসলিম জনগণের ঈমান, আকিদা ও চরিত্র গঠনের কাজে ব্যাপৃত থাকেন।

এ সময় তিনি কয়েকটি নতুন গ্রন্থ রচনা করেন।

Leave a Reply